বাড়ি নির্মাণ শুধু ইট-পাথরের কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনুমোদন প্রক্রিয়া, আইনি বাধ্যবাধকতা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশের বিষয়। বাড়ি করার সময় জমি থেকে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে, না ছাড়লে কী হতে পারে—এসব বিষয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা থাকে না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান এই বিষয়গুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দূরত্ব বা জায়গা ছাড়ার নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক। আইন অমান্য করলে অর্থদণ্ড, মামলা বা অন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বাড়ির নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষা করতে নিয়মগুলো পালন করা জরুরি। শুধু নিজের সুবিধার জন্য নয়, প্রতিবেশী এবং কমিউনিটির স্বার্থে এই নিয়মগুলো মানা উচিত। আইনজীবী ইশরাত হাসান সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছেন যে, অনুমোদন ছাড়া বাড়ি নির্মাণ করা আইনি ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নির্মাণের আগে স্থান, দূরত্ব ও অন্যান্য বিধি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন।
বাড়ি নির্মাণের আগে কী কী বিষয় মনে রাখা জরুরি:
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেছেন, বাড়ি নির্মাণের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জমির আইনগত অবস্থা যাচাই করা। দলিল, খতিয়ান, নামজারি এবং খাজনা দাখিলা সব কিছু ঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর আসে ভবনের নকশা অনুমোদন। ভবনের কাঠামো তৈরিতে একজন অনুমোদিত স্থপতি বা প্রকৌশলীর সহায়তা নেওয়া উচিত। এতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি ২০২০) অনুযায়ী নিরাপত্তা, আলো-বাতাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নি প্রতিরোধ এবং ভূমিকম্প সহনশীলতার নিয়মগুলো মানা যায়। একই সঙ্গে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ড্রেনেজ এবং সেপটিক ট্যাংকের পরিকল্পনা আগে থেকেই ঠিক করা জরুরি।
গ্রাম ও শহরে বাড়ি নির্মাণে কি একই নিয়ম প্রযোজ্য?
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, গ্রাম ও শহরে বাড়ি নির্মাণের নিয়ম পুরোপুরি একই নয়। রাজধানীতে রাজউক, চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং রাজশাহীতে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) শহরের অন্যান্য অংশে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী। সেখানে নির্দিষ্ট সেটব্যাক, ওপেন স্পেস, উচ্চতা, রাস্তার পাশের দূরত্ব এবং নিরাপত্তার বিধান মানা বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি নির্মাণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া ন্যূনতম খোলা জায়গা রাখা, প্রতিবেশীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ না করা এবং পানি ও নিকাশের সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা আবশ্যক। শহরে নিয়ম ভাঙলে জরিমানা করা হয় বা ভবন ভেঙে ফেলার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বাড়ি করার সময় কতটুকু জায়গা ছাড়তে হয়, আইন কী বলে?
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি ২০২০) অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণের সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা বা ‘সেটব্যাক’ রাখা বাধ্যতামূলক। সাধারণভাবে সামনের রাস্তার দিকে ৫ থেকে ১০ ফুট, পেছনে ৪ থেকে ৬ ফুট এবং দুই পাশে ৩ থেকে ৫ ফুট খোলা জায়গা রাখা উচিত। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব আরও বেশি হতে পারে। মোট জমির অন্তত ৩০ শতাংশ খোলা জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক। এতে আলো-বাতাস চলাচল, ড্রেনেজ এবং অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এই নিয়ম শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলেও প্রযোজ্য। যদিও গ্রামে তদারকি তুলনামূলক কম।
জায়গা না ছেড়ে বাড়ি করলে কী সমস্যা হতে পারে:
জায়গা না ছেড়ে বা অনুমোদন ছাড়া বাড়ি নির্মাণ হলে সেটিকে আইন এ ‘অবৈধ নির্মাণ’ হিসেবে গণ্য করে। ফলাফল কঠোর হতে পারে। রাজউক, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন ওই ভবন ভেঙে দিতে পারে। মালিকের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। জরিমানা আর অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কখনো কখনো বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহও বিচ্ছিন্ন করা হয়।
প্রতিবেশীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ বা তাদের আলো-বাতাস বন্ধ করলে প্রতিবেশী আদালতে মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। এছাড়া অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের সময় যদি পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা না থাকে তখন উদ্ধারকার্য ব্যাহত হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের প্রাণহানি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। সব মিলিয়ে জায়গা ছেড়ে আইন মেনে বাড়ি করা সবচেয়ে নিরাপদ ও ঝামেলাহীন উপায়।
অনুমোদন ছাড়া বাড়ি করলেই কি পরে বৈধ করা যায়?
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, কিছু ক্ষেত্রে পরে রেগুলারাইজেশন করে বৈধ করা যেতে পারে। তবে তা সীমিত পরিসরে। সাধারণত মালিককে জরিমানা দিতে হয়। সাথে একজন অনুমোদিত স্থপতি বা প্রকৌশলী নিয়া নকশা পুনরায় জমা দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জমা দেওয়া নকশা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু যেখানে ভবনটি সরাসরি সড়কের ওপর, সরকারি জমিতে বা নির্ধারিত সেটব্যাক না রেখে তৈরি হয়েছে সেখানে রেগুলারাইজ করা যায় না। এমন ক্ষেত্রে ধ্বংসের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংক্ষেপে বললে, পরবর্তীতে কিছু ভুল ঠিক করা সম্ভব। তবে সীমা আছে। বড় ধরনের অনিয়ম হলে বৈধ করা সম্ভব নয় এবং আইনি জরিমানা বা ভাঙার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়।
বাড়ির উচ্চতা বা তলা সংখ্যার সীমা কত?
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা এলাকার ধরন, রাস্তার প্রস্থ ও জমির আকার অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
- সরু রাস্তায় সাধারণত চারতলার বেশি করা যায় না।
- বড় রাস্তার পাশে বা বাণিজ্যিক এলাকায় ১০ তলা বা তার বেশি হতে পারে। তবে প্রতিটি ভবনের জন্য রাজউক বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) অনুযায়ী তলা ঠিক করা হয়।
পানি ও নিকাশ ব্যবস্থার আইনি বাধ্যবাধকতা: আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, নগর বা শহরে প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল এবং রেইন ওয়াটার ড্রেনেজ সিস্টেম বাধ্যতামূলক। শহরে ওয়াসা বা পৌর ড্রেনের সঙ্গে সংযোগ নিতে হয়। এসব ব্যবস্থা না থাকলে ভবনের অনুমোদন বাতিল হতে পারে বা পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানা দিতে পারে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
- শ্রমিকদের জন্য সেফটি হেলমেট, জুতা ও বেল্ট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ফায়ার এক্সিট এবং জরুরি সিঁড়ি রাখা বাধ্যতামূলক।
- কাজের সময় আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা ও রাস্তার চলাচল বাধাগ্রস্ত না করা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ম ভঙ্গ করলে শ্রম আইন ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী মামলা হতে পারে।
পরিবেশবান্ধব নির্মাণ:
বাড়ির ডিজাইনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের প্রবেশ, সবুজ জায়গা, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এবং সোলার সিস্টেম রাখলে ভবন পরিবেশবান্ধব হয়। বিএনবিসি ও পরিবেশ অধিদপ্তর এখন টেকসই ভবন নির্মাণকে উৎসাহিত করছে। এতে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বিল কমানো এবং শীতল পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা পাওয়া যায়।

