বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম সফল উৎপাদন খাত হিসেবে পরিচিত কিন্তু এখন খাতটি গভীর সংকটে রয়েছে। কারণ, উৎপাদন ব্যয় লাগামছাড়া বেড়ে গেলেও সরকারের নির্ধারিত মূল্যসীমা ২০২২ সালের পর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ সালের পর থেকে মূল্য সমন্বয় বন্ধ রয়েছে। কাঁচামালের দাম বাড়া, ডলারের অস্থিরতা, বিদ্যুৎ–গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ—সব মিলিয়ে অনেক কোম্পানি টানা লোকসান ভোগ করছে। কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ ইতোমধ্যে উৎপাদন লাইনের বাইরে চলে গেছে। ফলে রোগীরা বাধ্য হয়ে বহুগুণ দামী আমদানিকৃত ওষুধের ওপর নির্ভর করছেন। ওষুধ কোম্পানিগুলো বলছে, অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত দাম উৎপাদন ব্যয়ের অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে ন্যূনতম ব্যাচ উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে না। আইনগতভাবে দাম বাড়ানো না গেলে, খাতটি ভাঙনের মুখে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের মহাসচিব ডা. জাকির হোসেন বলেন, ২০১৮ সালের পর থেকে দাম নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে। ২০২২ সালের পর সামগ্রিক কোনো মূল্য পুনর্বিবেচনা হয়নি। ডা. জাকির -কে বলেন, “মানুষ ভাবছে দাম বেড়েছে। কিন্তু ২০২২ সালের আগের অনুমোদনের ভিত্তিতে কেবল অল্পকিছু পণ্যের দাম পরিবর্তন হয়েছে। সেটাও বাজারে প্রতিফলিত হতে অনেক মাস লাগে।” তিনি আরও বলেন, ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন, ২০২৩-এর ৩০ ধারার অধীনে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি ওষুধের তালিকা তৈরি এবং নিয়মিত মূল্য পুনর্বিবেচনা।
রেনাটার সিইও ও এমডি এস. সৈয়দ কায়সার কবীর বলেন, কাঁচামালের দাম অনেক ওষুধের বিক্রয়মূল্যের উপরে চলে গেছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, কঠোর মুদ্রানীতি এবং উচ্চ সুদ এই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। তিনি বলেন, “কিছু পণ্য এখন প্রকৃত অর্থে লোকসানী। দ্রুত মূল্য সমন্বয় না হলে আরও কোম্পানি এগুলোর উৎপাদন বন্ধ করবে।”
মূল্য ব্যবধানের চাপে বাজার থেকে উধাও ফেনোবারবিটোন:
মৃগী রোগ বা খিচুনির চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ফেনোবারবিটোন এখন সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ট্যাবলেটটির সরকারি খুচরা মূল্য প্রতি পিস ৪৭ পয়সা নির্ধারিত। অথচ কাঁচামাল, পরিবহন, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়সহ উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ৮৫ পয়সা। স্থানীয় কোম্পানিগুলো এই ব্যবধান বহন করতে না পারায় উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এখন রোগীরা সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত সংস্করণের ওপর নির্ভরশীল, যার দাম প্রতি পিস ৮–১০ টাকা। অর্থাৎ স্থানীয় মূল্যের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।
রেনাটার সিইও ও এমডি এস. সৈয়দ কায়সার কবীর বলেন, “দাম অন্তত এক টাকা হলেও স্থানীয় কোম্পানিগুলো উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারত। তখন রোগীরাও আমদানি করা ওষুধের তুলনায় কম মূল্য দিতে হতো।” এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস এখনও প্রায় ৩০টি ওষুধ লোকসানে উৎপাদন করছে। সিইও মহিবুজ জামান বলেন, “শুধুই রোগীদের প্রয়োজনের কারণে আমরা এগুলো উৎপাদন করি। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, ইউটিলিটি ব্যয় বাড়ছে, প্রতি বছর বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পায়। আমরা দ্বিমুখী সংকটের মাঝে আছি। বাংলাদেশে ওষুধের দাম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম, তবু মানুষ মনে করে ওষুধ খুব দামি।” হেলথ কেয়ার ফার্মা ১৮টি ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করেছে। প্রতিটির লোকসান ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, “২০২৪ সালে সামান্য মূল্য সমন্বয়ও কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনেনি।”
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান আব্দুল মুকতাদির বলেন, প্যারাসিটামলের দামই সংকট বোঝার জন্য যথেষ্ট। গত ২০ বছরে এর উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ গুণ বেড়েছে, কিন্তু খুচরা মূল্য এখনও ১.২০ টাকা। আদর্শভাবে এর দাম ২৬ টাকা হওয়া উচিত। মুকতাদির জানান, “প্রতিবার দাম বাড়ানোর কথা তুললে বলা হয়, ওষুধের দাম কম রাখতে হবে। ২০১৭ সালের পর থেকে কোনো অর্থবহ পুনর্বিবেচনা হয়নি। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, আইএমএস-এর ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী দেশের শীর্ষ ১০০ ওষুধ কোম্পানির ৭০ শতাংশ এখন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। বাকি কোম্পানিগুলো কষ্টসাধ্যভাবে ব্রেক ইভেন পয়েন্টে আছে। ফলে ওষুধ শিল্পে ভবিষ্যৎ পুনঃবিনিয়োগ এবং মানোন্নয়নের প্রশ্ন উঠছে।
লাভের মার্জিন এত কম, টিকে থাকা কঠিন:
বিএপিআই মহাসচিব ডা. জাকির হোসেন বলেন, টিকে থাকার হিসাবটা খুবই কঠিন। খুচরা মূল্য ১০০ টাকার মধ্যে মাত্র ৭৫ টাকা কোম্পানির কাছে আসে। বাকিটা খুচরা কমিশন ও ভ্যাটে চলে যায়। এই ৭৫ টাকা দিয়েই কাঁচামাল, শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকের সুদ, কর, পরিবহন, নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত ব্যয় এবং সেলস-প্রমোশন খরচ বহন করতে হয়।
ডা. জাকির বলেন, “এসব খরচ বাদ দেওয়ার পর হাতে যা থাকে, তা খুবই সামান্য। অনেকক্ষেত্রে হাতে কিছু থাকে না। বড় কোম্পানিগুলো ৫০০–১০০০ পণ্যের আয় দিয়ে ক্ষতি সামাল দিতে পারে। কিন্তু ছোট কোম্পানির ৩০–৫০টি পণ্য থাকে। এর মধ্যে ১০টিও লোকসানে গেলে পুরো কোম্পানি ধসে পড়ে।”
রেনাটা বন্ধ করেছে ১৫০টির বেশি ওষুধ উৎপাদন:
উৎপাদন বন্ধ হওয়া ওষুধের কোনো কেন্দ্রীয় তালিকা নেই। তবে কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী চিত্র ভয়াবহ। রেনাটা তাদের নিবন্ধিত ৬২৬টি পণ্যের মধ্যে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ১০২টি ওষুধ এবং প্রাণিস্বাস্থ্যের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ৫০টি ওষুধের উৎপাদন স্থগিত করেছে।
রেনাটার সিইও এস. সৈয়দ কায়সার কবীর বলেন, “অনেক পণ্যের কাঁচামাল ব্যয় বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। ২০২৫ সালে রেনাটা একাই ১৫০টির বেশি আইটেম বন্ধ করেছে। সংস্কার না হলে কোম্পানিগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাবে।” তিনি আরও জানান, রেনাটা সামগ্রিকভাবে লাভজনক থাকলেও বর্তমান মার্জিন দিয়ে পুনঃবিনিয়োগ এবং মানোন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।
ছোট কোম্পানিগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে:
ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক কোম্পানি পুরো উৎপাদন লাইন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে অ্যালঝাইমার, পারকিনসন, সংক্রমণ, অ্যানেস্থেশিয়া, মৃগী ও মনোরোগ চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ওষুধও অন্তর্ভুক্ত। জরুরি জীবন রক্ষাকারী কিছু ওষুধের উৎপাদনও ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে, নইলে পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।
এপেক্স গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এপেক্স ফার্মার ৩৫০টি নিবন্ধিত পণ্য রয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগই এখন লোকসানে বিক্রি হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৪০টির বেশি আইটেম উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠানটি ১০টি অ্যান্টিবায়োটিকের মূল্য সমন্বয়ের আবেদন করেছিল। তবে প্রায় এক বছর পরও অনুমোদন মেলেনি।
এপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কাজুড়ি বলেন, “আমাদের ১৫০টির বেশি ওষুধ লোকসানে চলছে। মোট লোকসান ৩০ কোটি টাকার বেশি। প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে উৎপাদন চালিয়ে গেছি, কিন্তু এভাবে আর বেশি দিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।” রেফকো ফার্মাসিউটিক্যালসের অবস্থা আরও খারাপ। দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি ১২০টির বেশি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন করত। এখন এর প্রায় অর্ধেকই উৎপাদন হচ্ছে না।
কোম্পানির পরিচালক মামুন রহমান বলেন, “বড় কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়ে বা অন্যান্য পণ্যের মুনাফা দিয়ে ক্ষতি সামাল দিতে পারে। আমাদের মতো ছোট কোম্পানির পক্ষে শুধু টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।” শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, দেশের ২৫০টির বেশি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে শীর্ষ দশটির বাইরে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান তীব্র আর্থিক চাপে রয়েছে।
বিএপিআই সভাপতি আব্দুল মুকতাদির বলেন, রাজনৈতিক কারণে ওষুধের দাম স্থির রাখার প্রচেষ্টা দেশীয় উৎপাদকদের টিকিয়ে রাখতে পারছে না। তিনি বলেন, “আগে ১ ডলারের কাঁচামাল কিনতে ৮৬ টাকা লাগত, এখন লাগে ১২৩ টাকা। যেসব ওষুধ আগে ৫–১০ টাকা লাভ দিত, এখন সেগুলোই লোকসান দিচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞ, কর্তৃপক্ষ ও ক্যাবের ভাষ্য:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ভোক্তা, নীতিনির্ধারক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবাইকে আরও বাস্তববাদী হতে হবে। তিনি বলেন, “পাঁচ বছর আগে যে দামে জিনিস কিনেছি, এখনো সেই দামে কিনব—এটা আশা করা ঠিক নয়। মানুষের আয় সীমিত, ব্যয় বাড়লে চাপ পড়ে—এটাও ঠিক। তবু বাণিজ্যিক পণ্যের দাম বছরের পর বছর স্থির থাকতে পারে না।” ড. হামিদ সতর্ক করে জানান, স্থানীয় কোম্পানিগুলো লোকসানের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে বিদেশি ওষুধ বাজার দখল করবে। তখন আমদানিকৃত ওষুধ আরও ব্যয়বহুল হয়ে যাবে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আকতার হোসেনকে শিল্পের সামগ্রিক সংকট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি টিবিএসকে বলেন, “পরিস্থিতি এত গুরুতর—এমনটা আমরা অবগত নই। আমরা কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে দাম অনুমোদন দিই। কোম্পানিগুলো আবেদন করলে আমরা পর্যালোচনা করে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।” তিনি আরও জানান, অধিদপ্তর সম্প্রতি নতুন ওষুধ অনুমোদনের জটিলতার সমাধান করেছে। এবার মূল্যসংক্রান্ত বিষয়গুলোও দেখা হবে।
অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ওষুধ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্যাবের কোষাধ্যক্ষ ডা. মঞ্জুর-এ-খোদা তরফদার বলেন, “২০২২ সালে কিছু ওষুধের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল। আদালতের পিটিশনের পর এখন আর দাম বাড়ানো হচ্ছে না। আমরা চাই সরকার উৎপাদন ব্যয় এবং ভোক্তার ক্রয়সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করুক। কোনো কোম্পানিই যেন নিজ ইচ্ছায় দাম বাড়াতে না পারে।”

