বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে নতুন এক কৌশল সামনে এনেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। শুধু দাম বাড়ানো নয়, এবার আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধাপ বা স্ল্যাব পরিবর্তন করেও রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বর্তমান সুবিধা হারাতে পারেন বিপুল সংখ্যক গ্রাহক। পিডিবির পরিকল্পনায় বছরে দুই দফা বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের বিষয়ও যুক্ত করা হয়েছে।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহকের ওপর বাড়তি বিলের চাপ পড়তে পারে। এর মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যারা মাসে ২০০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এই শ্রেণির গ্রাহকেরা সাধারণত বাসায় বাতি, ফ্যান, ফ্রিজ ও টেলিভিশনের মতো প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করেন।
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে মাসে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে কম দামের সুবিধা পান, যাদের বলা হয় লাইফলাইন গ্রাহক। এরপর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপে পড়েন। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই দুই ধাপে দাম অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করলেই গ্রাহকদের উচ্চ দামের আওতায় পড়তে হবে।
বর্তমানে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা দ্বিতীয় ধাপে পড়েন। পিডিবি চাইছে, এই ধাপটি পরিবর্তন করে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত একই ধাপে আনা হোক। এর ফলে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত আলাদা সুবিধা আর থাকবে না।
এই পরিবর্তনের প্রভাব একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন গ্রাহক যদি মাসে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাহলে বর্তমান নিয়মে তার বিল হয় প্রায় ১ হাজার ২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, একই ব্যবহারে বিল দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। অর্থাৎ ধাপ পরিবর্তনের কারণেই বাড়তি খরচ হবে ১৪৫ টাকা ৫০ পয়সা।
এর সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের ইউনিট মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। এতে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে ২০০ ইউনিট ব্যবহারে বিল দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ টাকা। ফলে মাসিক বাড়তি খরচ দাঁড়াতে পারে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এর বাইরে ডিমান্ড চার্জ ও মূল্য সংযোজন কর আলাদা যুক্ত হবে।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, দরিদ্র শ্রেণির গ্রাহকদের বিদ্যুৎ দামে পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। মূলত বেশি ব্যবহারকারীর ওপর চাপ দিয়ে রাজস্ব বাড়ানোই লক্ষ্য। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ খাতের বড় ঘাটতি পূরণ করতেই এই পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপও বড় কারণ।
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, জ্বালানি কেনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল পরিশোধে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ডলারের দাম ও জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে।
পিডিবি শুধু একবার নয়, প্রতি ছয় মাস পরপর বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি মূল্য কাঠামো নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে। এতে জ্বালানির দাম বাড়লে বা কমলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুতের দামও পরিবর্তিত হবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেন, ঘাটতির দায় ভোক্তার ওপর চাপানো হচ্ছে। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উচিত আগে নিজেদের ব্যয় কমানো। তিনি আরও বলেন, ধাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা হচ্ছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ধাপ পরিবর্তন মূলত কম ব্যবহারকারীদের সুবিধা দিতে করা হয়েছিল। এখন বিষয়টি নিয়ে কারিগরি কমিটি কাজ করছে। শুনানির মাধ্যমে সব প্রস্তাব যাচাই করে ভোক্তা স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নতুন প্রস্তাবে ধাপ পরিবর্তন ও দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে বিশেষ করে মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বিলের চাপ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি এখন নিয়ন্ত্রক কমিশনের পর্যালোচনায় রয়েছে।
সিভি/এম

