বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরোধিতা দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বেশির ভাগ সংগঠন বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতেই সরকার সম্প্রতি পতেঙ্গার লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং ঢাকার পানগাঁও টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। সরকারের দাবি, এই চুক্তি বন্দরের গতিশীলতা বাড়াবে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর বিরোধিতা আরও তীব্র হয়েছে। বাতিলের দাবিতে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ করছে। চুক্তি বাতিলের দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) আগামী ৫ ডিসেম্বর সমাবেশ ও মশাল মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের বন্দর ইজারা দেওয়ার এখতিয়ার নেই।
স্কপ চট্টগ্রামের যুগ্ম আহ্বায়ক রিজওয়ানুর রহমান খান বলেন, বন্দরের এনসিটি দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। পাশাপাশি লালদিয়া চর ও পানগাঁও টার্মিনালের ইজারা চুক্তি বাতিল করতে হবে। অন্যথায় আন্দোলন চলবে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনায় সৌদি কোম্পানি রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের সঙ্গে চুক্তির কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। লালদিয়া ও পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনালের চুক্তির তথ্যও আগের মতো গোপন রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, তারা সব সময় বন্দরের উন্নয়নে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানান। তবে বিনিয়োগ কতটা লাভজনক হবে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, চুক্তি স্বচ্ছ হলে এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা না করলে সমস্যা হওয়ার কারণ নেই। তিনি বলেন, যে কোম্পানিগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগে এসেছে, তারা বিশ্বের অন্যান্য বন্দরেও কাজ করছে। তাই সরকার যদি এসব চুক্তি দেশের জন্য কতটা লাভজনক হবে তা জনসাধারণকে জানায়, তাহলে সবার আস্থা বাড়বে।
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, তারা এই চুক্তিকে সমর্থন করেন এবং এটিকে ভালো সিদ্ধান্ত মনে করেন। তবে তিনি জানান, চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। যেমন ৫০০ থেকে ৭০০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে—তারা কি দেশি, নাকি বিদেশি? চুক্তির মেয়াদ বাড়বে কি না, বাংলাদেশ সাইনিং মানি কবে পাবে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী—এসব বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। তার মন্তব্য, এসব তথ্য জানানো হলে সম্ভাব্য দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ পাওয়া যেত।
বছরের শুরু থেকেই বন্দর টার্মিনাল বিদেশিদের ইজারা না দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করছে চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের চুক্তির পর এসব কর্মসূচি আরও জোরদার হয়েছে।
এদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা, বন্দর কর্তৃপক্ষের শোকজ নোটিশ এবং বন্দর এলাকায় পুলিশের সব ধরনের সভা, সমাবেশ ও বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। বর্তমানে বন্দর রক্ষা পরিষদ, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), বন্দর রক্ষা ও করিডরবিরোধী আন্দোলন, গণমুক্তি ইউনিয়ন, বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মশাল মিছিল, সমাবেশ, বিক্ষোভ ও অবরোধসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। “যাওয়ার হুমকি আসছে। আন্দোলন করায় বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাকে শোকজ করেছে। তবুও আমি আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াব না,” বলেছেন একজন বন্দর কর্মী।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চট্টগ্রাম ও ঢাকার দুই বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, “নিজেদের ঘোষণা অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী দু–তিন মাসের বেশি ক্ষমতায় নেই। এ ধরনের সরকার কী কারণে ৪০–৫০ বছরের এমন চুক্তি করবে, যেটা পুরো অর্থনীতি ও দেশকে প্রভাবিত করবে? এ চুক্তিতে অনেক উদ্বেগের বিষয় আছে। তা কী কারণে গোপন ও তাড়াহুড়া করে ছুটির দিনে করা হলো? তারা এ ধরনের চুক্তি করার এখতিয়ার কীভাবে পায়?” আগের সরকারের সময়ে যে কোম্পানিকে টেন্ডার ছাড়াই বন্দর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, নতুন সরকার কেন দ্রুত সেই কোম্পানির কাছে দিতে চায়—এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন “ডেনমার্কের কোম্পানিকে বন্দর ইজারা দিয়ে তিন বছরে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ আনার কথা বলা হচ্ছে। এর ফলে বন্দর আমাদের হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া বন্দরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও নিরাপত্তার দিক থেকেও বিপদের সম্ভাবনা আছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯০ শতাংশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। অবস্থান ও কৌশলগত দিক থেকে এ বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” চুক্তি স্বাক্ষরের পর সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে বন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত ১৭ নভেম্বর ঢাকার একটি হোটেলে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের মায়ের্সক গ্রুপের এপিএম টার্মিনালস এবং ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডলগ (এমএসসি শিপিং কোম্পানি)-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চুক্তির সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তা জানান, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের চুক্তি ৩৩ বছরের জন্য করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণে ধরা হয়েছে ৩ বছর এবং বাকি ৩০ বছর টার্মিনাল পরিচালনা করবে প্রতিষ্ঠানটি। শর্ত পূরণ হলে মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ আছে।
টার্মিনালে তিনটি জেটি থাকবে। প্রতিটি জেটে একসাথে একটি করে জাহাজ ভেড়ানো যাবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি এই জেটি নির্মাণের জন্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বন্দর এককালীন ২৫০ কোটি টাকা ফি পাবে। এছাড়া জেটির সামনে খননকাজ নিজের খরচে করবে প্রতিষ্ঠানটি। বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৮ লাখ টিইইউএস (একক) কনটেইনার ওঠা-নামা করলে প্রতি একক কনটেইনারে বন্দর মাশুল হিসেবে পাবে ২১ ডলার। ৮ লাখের বেশি, অর্থাৎ ৯ লাখ একক কনটেইনার হলে মাশুল বেড়ে হবে ২৩ ডলার। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বন্দর কর্তৃপক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।
লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জায়গা থেকে কয়েক বছর আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হলেও অনেক এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। চুক্তিতে তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয় উল্লেখ আছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, শর্ত পূরণ না হলে প্রথমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠানো হবে। তবুও শর্ত পূরণ না করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তি বাতিল করতে পারবে এবং সেই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কোনো ক্ষতিপূরণ পাবেনা। তবে যদি বন্দর কর্তৃপক্ষের শর্ত ভঙ্গের কারণে প্রতিষ্ঠান চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া চুক্তিতে নির্মাণকাজ শুরুর পূর্বশর্ত, নিরাপত্তা জামানত, প্রকল্প নকশা, টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত, পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা, ন্যূনতম সেবার মান, মাশুল, চুক্তি বাতিল এবং বাতিল হলে ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে। লালদিয়া ও পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি নিয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত শঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, “বিদেশি অপারেটরদের নিয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত শঙ্কা ভুল ধারণা। এসব চুক্তি সম্পূর্ণ বাংলাদেশের মালিকানায় থাকবে।” তিনি আরও বলেন, “এটি ৩০ বছরের একটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ চুক্তি। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর হবে, স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

