চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডির তথ্য বলছে, জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে ঋণের প্রতিশ্রুতি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সময়ে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২১৯ বিলিয়ন ডলারে। একই সঙ্গে ঋণের অর্থছাড়ও বেড়েছে। অর্থছাড়ের পরিমাণ ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ৫২২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। সে সময় অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৫৪৩ বিলিয়ন ডলার।
ইআরডির গতকাল সোমবার ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য পাঁচ মাসে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে, তার প্রায় সমপরিমাণ অর্থই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট পরিশোধ করা হয়েছে ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ বাড়লেও ঋণ প্রাপ্তি ও কিস্তি পরিশোধ প্রায় সমান হওয়ায় নিট বৈদেশিক অর্থায়ন খুব একটা বাড়েনি।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার সংকটের কারণে ঋণের প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি আবার বাড়তে শুরু করেছে। তারা আরও বলেন, আগের বছরগুলোতে নেওয়া বহু উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট সহায়তা ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী কয়েক মাসে বৈদেশিক ঋণের গতি অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। সামনে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি না এবং সব রাজনৈতিক দল ফলাফল মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক মহল একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেবে এবং ফলাফল মেনে নেবে। এটি বাংলাদেশের জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়। সরকার পরিবর্তন ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে তখন উন্নয়ন অংশীদারদের নতুন প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্প অনুমোদন কমে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরে সেই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এখন আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। রাজস্ব নীতি ও বৈদেশিক সহায়তা ব্যবস্থাপনায় স্পষ্টতা এসেছে।
মাসরুর রিয়াজের মতে, অনেক উন্নয়ন অংশীদার এখনো নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বাচন শেষে একটি স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে নতুন নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে তারা নতুন প্রকল্প ও ঋণ প্রতিশ্রুতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে।
ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১ দশমিক ২১৫ বিলিয়ন ডলার। সুদ বাবদ পরিশোধ হয়েছে ৬৭৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ০৫৫ বিলিয়ন ডলার ও ৬৫৫ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার।
জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে সর্বোচ্চ ৫৮১ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির কাছ থেকে। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে মাত্র ১৮ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় দিয়েছে রাশিয়া। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে দেশটি ছাড় করেছে ৫৫২ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া বিশ্বব্যাংক ছাড় করেছে ৪২৮ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন ডলার। এডিবি দিয়েছে ৩৩৫ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ডলার। চীন দিয়েছে ১৯৪ মিলিয়ন ডলার। জাপান দিয়েছে ৮৮ দশমিক ৮১ মিলিয়ন ডলার এবং ভারত দিয়েছে ৮৬ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার।

