চলতি বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। রাজস্ব নীতিতে বড় পরিবর্তন, প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্গঠন, কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ ও বরখাস্ত, কর ফাঁকি ও দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি ডিজিটাল কর ব্যবস্থার বিস্তার—সব মিলিয়ে সংস্থাটি এক গভীর ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে।
বছরের শুরু থেকেই এনবিআর নিয়ে আলোচনার সূচনা হয় কর ও রাজস্ব নীতিতে পরিবর্তনের কারণে। সরকার এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি করে। ১২ মে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এ অধ্যাদেশ কার্যকর হয়। দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়ায় এটি এক যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে দেখলেও একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী আন্দোলনে নামে। অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের হলে শুনানি একাধিকবার মুলতবি হয়।
এই প্রশাসনিক পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানকে অপসারণের দাবি তোলা হয় এবং তাকে রাজস্ব ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। সংগঠনটি অভিযোগ করে, নতুন কাঠামোর খসড়া প্রণয়ন থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বচ্ছ আচরণ করেননি। এতে অসহযোগ কর্মসূচি ও প্রতিবাদের কারণে রাজস্ব ভবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
অস্থিরতার মধ্যেই শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে একের পর এক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলায় শুল্ক, কর ও ভ্যাট বিভাগের ১৪ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একইভাবে হোয়াটসঅ্যাপে চেয়ারম্যান সম্পর্কে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্যের কারণে এক নিরাপত্তা প্রহরীকেও বরখাস্ত করা হয়। এসব ঘটনায় এনবিআরের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
দুর্নীতির অভিযোগও বছরজুড়ে এনবিআরকে বিব্রত করে। ঘুষের বিনিময়ে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করার অভিযোগে ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে। এর মধ্যে শীর্ষ কর্মকর্তা বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা রয়েছে এবং তাকে ওএসডি করা হয়। এসব ঘটনায় রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
এছাড়া প্রতারণার ঘটনাও ঘটেছে। চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয়ে একটি চক্র বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ দাবি করে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এনবিআর জানায়, প্রকৃত ব্যক্তির সঙ্গে এই প্রতারণার কোনো সম্পর্ক নেই।
রাজস্ব আদায় ও কর ব্যবস্থাপনায় এনবিআর এ বছর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। প্রথমবারের মতো অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় করদাতাদের সুবিধার জন্য রিটার্ন জমার সময়সীমা একাধিক দফায় বাড়িয়ে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়। সারাদেশের সব কর অঞ্চলে ই-রিটার্ন সহায়তাকেন্দ্র ও কল সেন্টার চালু করা হয়। অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগও দেওয়া হয়, যা ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
তবে ‘শূন্য রিটার্ন’ নিয়ে এনবিআরের কঠোর অবস্থান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর পর এনবিআর জানায়, প্রকৃত আয়, ব্যয় ও সম্পদের তথ্য গোপন করে শূন্য রিটার্ন দাখিল করা ফৌজদারি অপরাধ। এ জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।
নীতিগত দিক থেকেও বছরটি ঘটনা সমৃদ্ধ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে বিস্কুট, আটা, ময়দা, লবণ, বিভিন্ন ভোজ্যতেল ও এলপি গ্যাসে ভ্যাট অব্যাহতি বা হ্রাস করা হয়। বিস্কুট ও কেকের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ করা হয়। সুপারশপে খুচরা মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত ভ্যাট আদায় নিষিদ্ধ করা হয়। ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে কুঁড়ার তেল রপ্তানিতে ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়।
আমদানি নীতিতেও পরিবর্তন আসে। বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে এয়ার পিউরিফায়ারের শুল্ক কমানো হয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে ইবুককে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়। সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে ছাড় প্রযোজ্য হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদ পরিবারের সদস্যদের জন্য সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন ছাড় দেওয়া হয়।
এ বছর এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল কয়েকটি আলোচিত অভিযান চালায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে পূবালী ব্যাংকের একটি লকার জব্দ করা হয়, যেখানে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ পাওয়া যায়। এছাড়া সাবেক সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা ৩১টি বিলাসবহুল গাড়ি সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২০২৫ সাল এনবিআরের জন্য ছিল সংস্কার ও ডিজিটাল অগ্রগতির বছর। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, দুর্নীতির অভিযোগ ও নীতিগত বিতর্কও চলেছে। নতুন কাঠামোর অধীনে রাজস্ব প্রশাসন কতটা কার্যকর ও স্থিতিশীল হবে, তা নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ।

