অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে বড় সংস্কার হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুটি বিভাগ গঠন করা হয়। অধ্যাদেশটি জারি করা হয় ১২ মে, এবং এখন এর বাস্তবায়নের কাজ চলমান। সরকারের নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই দুটি বিভাগ কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
তবে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই সংস্কারের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আন্দোলন করেছেন। কয়েক দিন পুরো কার্যক্রম থমকে যায়। রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন প্রত্যাহারের পর এনবিআরের সদস্য, কমিশনারসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত ও অবসরে পাঠানো হয়। এটি এনবিআরের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা।
অবশ্য আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে সরকার রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা উভয় বিভাগে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগসহ অধ্যাদেশে কিছু সংশোধনী আনে। এখন দুটি বিভাগের কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। তবে এখনও সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে কাজ শুরু করা যায়নি।
দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা রাজস্ব খাতের নীতি ও আদায় আলাদা করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের যুক্তি হলো, যারা রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করবেন, তারা একই সঙ্গে কর আদায় করলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এতে অযাচিত শুল্ক-কর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
রাজস্ব খাত সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো করহার নির্ধারণের মতো নীতিগত কাজ এবং কর আদায় পৃথক রাখা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণের একটি শর্ত ছিল রাজস্ব নীতি ও আদায়ের কাজ আলাদা সংস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করা। বাংলাদেশ এখনও জিডিপির মাত্র ৭–৮ শতাংশ কর আদায় করে। দেশের কর–জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কম।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “রাজস্ব খাতের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। দেরি করলে অর্থনীতির সুযোগ নষ্ট হবে।”
সংস্কারের ধারাবাহিকতা:
অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব খাত সংস্কারের জন্য এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। ২০২৫ সালের শুরুতে কমিটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রস্তাব জমা দেয়। কয়েক মাস পর মে মাসে এনবিআর বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, রাজস্ব নীতি বিভাগ কর আইন প্রয়োগ ও কর আদায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। রাজস্ব সংগ্রহের মূল দায়িত্ব থাকবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের। প্রশাসনিক পদগুলোতে প্রশাসন ক্যাডারসহ আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে। তবে বিসিএস আয়কর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলে দাবি ওঠে।
অধ্যাদেশ জারির পর দেড় মাস ধরে জুনে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন চালান। জুনের শেষ দিকে দেশের শুল্ক-কর কার্যালয়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অবস্থা স্থবির হয়ে যায়। আন্দোলনের পরে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় কর্মসূচি স্থগিত হয়। এরপরে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত, বদলি ও অবসরে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নেতৃত্বে একটি কমিটি অধ্যাদেশ সংশোধনের জন্য গঠন করা হয়। কমিটি ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হয়।
মূল সংশোধনী:
-
রাজস্ব নীতি বিভাগের সচিব পদে নিয়োগে সরকার এখন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তাকে অগ্রাধিকার দেবে।
-
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদেও অভিজ্ঞ কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হবে।
-
উভয় বিভাগে জনবল নিয়োগেও সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, “দুটি বিভাগ যেন দ্রুত কাজ শুরু করতে পারে, তার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আশা করি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এটি সম্ভব হবে।”

