বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরে নীরব এক পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় যেখানে জীবিকার প্রধান ভরসা ছিল কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থান, সেখানে এখন অনেক তরুণ-তরুণী ঘরে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। ফ্রিল্যান্সিং শুধু ব্যক্তিগত আয়ের নতুন পথই তৈরি করেনি, বরং বহু গ্রামের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন, ভার্চুয়াল মুদ্রাভিত্তিক অর্থ গ্রহণ এবং অবৈধ আর্থিক কার্যক্রমের ঝুঁকিও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
লালমনিরহাটের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ২৫ বছর বয়সী এক তরুণ এই পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণ। একসময় তিনি ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালক ছিলেন। পরে সেই পেশা ছেড়ে অনলাইনে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি মাসে অন্তত ২ লাখ টাকা আয় করছেন। নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি এখন একটি পরিবহন ব্যবসা পরিচালনা করছেন। একই সঙ্গে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৩০ জন তরুণ-তরুণীর জন্য অনলাইনে কাজের সমন্বয়ও করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেনিয়া ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন ক্রেতার কাছ থেকে মূলত ওয়েবসাইট প্রচারসংক্রান্ত কাজ আসে। এসব কাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অনলাইন বিপণন কার্যক্রমের জন্য নতুন হিসাব তৈরি করতে হয়। তিনি সেই কাজ নিজের দলের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেন। প্রতিটি হিসাব তৈরির জন্য তিনি ৭ থেকে ৮ টাকা পান, যার মধ্যে ২ থেকে ৩ টাকা কর্মীদের দেওয়া হয়।
এই আয়ের মাধ্যমে তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের ১০ শতক জমি কিনেছেন এবং ভাড়ায় চলাচলকারী দুটি ছোট যাত্রীবাহী গাড়ির মালিক হয়েছেন। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যোগাযোগের জন্য তিনি বর্তমানে অনলাইনে ইংরেজি ভাষাও শিখছেন।
তার সাফল্যের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নেই। ওই গ্রামের অনেক তরুণ-তরুণী এখন ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং করছেন। বৈদেশিক মুদ্রায় আয় বাড়ায় বহু পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। টিনের ঘরের জায়গায় পাকা বাড়ি তৈরি হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি আয় করে পরিবারকে সহযোগিতা করছে এবং কম্পিউটার এখন অনেক পরিবারের প্রয়োজনীয় উপকরণে পরিণত হয়েছে।
একজন নারী ফ্রিল্যান্সার জানান, নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা শেষ করলেও তিনি চাকরিতে না গিয়ে অনলাইনে কাজ বেছে নিয়েছেন। বিভিন্ন অনলাইন হিসাব তৈরির কাজ করে তিনি মাসে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। তার স্বামীও আগে ঠিকাদারি করলেও এখন ফ্রিল্যান্সিং করেন। নবজাতক সন্তানকে দেখাশোনার পাশাপাশি দুজনে মিলিয়ে বর্তমানে মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে রয়েছে একটি বড় বাস্তবতা। অনেক ফ্রিল্যান্সার আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করছেন। তাদের দাবি, এসব মাধ্যমে প্রতি ডলারে অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় ৩ থেকে ৪ টাকা বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঝামেলাও তুলনামূলক কম।
অনেকেই জানিয়েছেন, তারা ভার্চুয়াল মুদ্রাভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করেন। কেউ কেউ আবার একাধিক ব্যাংকে হিসাব খুলে লেনদেন ছড়িয়ে রাখেন, যাতে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন কম ওঠে। লেনদেনের পরিমাণ বাড়ায় অনেকেই কর নথি খুলেছেন এবং আইনজীবীর সহায়তাও নিচ্ছেন।
তবে এই পদ্ধতিতে কাজ করার ঝুঁকিও কম নয়। কয়েকজন ফ্রিল্যান্সার জানান, বিদেশি ক্রেতা অনেক সময় কাজ নেওয়ার পর অর্থ পরিশোধ না করেই যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তখন স্থানীয়ভাবে কাজ করা কর্মীদের পারিশ্রমিক নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়। অর্থাৎ বেশি বিনিময় মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকলেও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও থেকে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, অনানুষ্ঠানিক অর্থ গ্রহণের এই প্রবণতা অর্থপাচারের জন্যও সুযোগ তৈরি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাঠাতে আগ্রহীরা স্থানীয় কিছু এজেন্টের মাধ্যমে বেশি বিনিময় মূল্য দিয়ে এই ধরনের লেনদেন পরিচালনা করে থাকে। তার মতে, বিষয়টি অনেকটা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদানের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, অনেক ফ্রিল্যান্সার এখনো বৈধ অর্থ গ্রহণের সুযোগ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনলাইন জুয়া, বাজি এবং ভার্চুয়াল মুদ্রাসংক্রান্ত লেনদেন এখন বিভিন্ন পেশা ও আয়ের মানুষের মধ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাকরিজীবীদের বার্ষিক লেনদেন ৬০০ কোটির টাকার বেশি, যা সবচেয়ে বড় অংশ। তবে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—গৃহিণী, কৃষক, জেলে এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত লেনদেন প্রায় ৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এতে বোঝা যায়, এই প্রবণতা শুধু শহরের উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গ্রামীণ সমাজ এবং সাধারণ পরিবারের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্রিল্যান্সার, প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট কর্মী এবং সৃজনশীল পেশাজীবীদের মাধ্যমে ২০০ কোটির টাকার বেশি সন্দেহজনক অর্থ প্রবাহের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া দিনমজুর, গৃহশিক্ষক, কোচিং পরিচালনাকারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ ধরনের লেনদেন বাড়ছে, যা প্রতারণা, আসক্তি কিংবা অন্যের মাধ্যমে হিসাব অপব্যবহারের ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের প্রবণতা থাকলেও বৈধ উপায়ে ফ্রিল্যান্সিং খাতের আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফ্রিল্যান্সিং সেবা থেকে দেশের আয় হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমান। ২০২১ অর্থবছরে এই আয় ছিল প্রায় ২০ কোটি ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক আয় ৫০ কোটি ডলারের ওপরে স্থিতিশীল রয়েছে।
বৈধ পথে অর্থ গ্রহণে উৎসাহ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নিয়মও শিথিল করেছে। জুলাই মাসে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ফ্রিল্যান্সাররা এখন প্ল্যাটফর্মের বিবরণ, ই-মেইলসহ বিভিন্ন ডিজিটাল নথির ভিত্তিতে রপ্তানি আয় গ্রহণ করতে পারবেন। প্রচলিত কাগজপত্রের বাধ্যবাধকতাও অনেক ক্ষেত্রে তুলে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া গ্রহণের সুযোগ, প্রতিবারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত অনলাইন অর্থপ্রদান ব্যবস্থার ব্যবহার, দ্বৈত মুদ্রার ফ্রিল্যান্সার কার্ড চালু এবং মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সাররা এখন তাদের রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে সংরক্ষণ করতে পারবেন। অন্যান্য সেবা রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদান প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দেশীয় ব্যাংকের অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যাতে বৈধ উপায়ে আন্তর্জাতিক লেনদেন আরও সহজ হয় এবং ফ্রিল্যান্সাররা নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী হন।
সব মিলিয়ে, ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সৃষ্টিতে এর ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে বৈধ অর্থপ্রদানের পথ আরও সহজ করতে হবে, সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং অনিয়ন্ত্রিত অর্থ লেনদেন ও অবৈধ ডিজিটাল কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই ফ্রিল্যান্সিং দেশের অর্থনীতির জন্য আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ একটি খাতে পরিণত হতে পারবে।

