বহু বছর ধরে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও বিক্রি না হওয়া পাথরের পাহাড়, ধারাবাহিক লোকসান এবং আমদানি করা পাথরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া—এসব সমস্যায় জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডকে ঘুরে দাঁড় করাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দেশীয় পাথরের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে একদিকে আমদানি নির্ভরতা কমে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে শক্ত ভিত্তি ফিরে পায়।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের নির্দেশনার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি সংস্থা মধ্যপাড়ার উৎপাদিত পাথর ব্যবহারের উদ্যোগ জোরদার করেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি পাথরের পরিবর্তে দেশীয় পাথরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে মধ্যপাড়া খনির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মধ্যপাড়া গ্রানাইট কোম্পানি মোট ২ লাখ ২ হাজার ৫১৩ টন ব্যালাস্ট পাথর সরবরাহের জন্য দুটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। জুন মাস পর্যন্ত ইতোমধ্যে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৬৬ টন পাথর সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন রেল প্রকল্পগুলোতেও পাথর সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
শুধু রেলওয়ে নয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডও তাদের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোকে নতুন প্রকল্প, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের নকশা এবং ব্যয় প্রাক্কলনে মধ্যপাড়ার পাথর অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে এই পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নদীশাসন ও ভাঙনরোধের আরও বিভিন্ন প্রকল্পে এর ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ৩ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উন্নয়ন প্রকল্পে মধ্যপাড়ার পাথরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা, সড়ক পরিবহন, নৌপরিবহন, রেলপথ, পানি সম্পদ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, আমদানি করা পাথরের তুলনায় দেশীয় পাথরের দাম কিছুটা বেশি হলেও সরকারি প্রকল্পে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি দরপত্রে এই পাথরের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে সরকারি নির্মাণকাজের প্রচলিত দরপত্রের মূল্যতালিকায় মধ্যপাড়ার পাথর অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি প্রকল্পে দেশীয় পাথরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, খনিটির উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। তখন মূলত রেলপথ ও নদীশাসন প্রকল্পেই পাথরের চাহিদা সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের নির্মাণ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কৌশলে তেমন পরিবর্তন আনা হয়নি।
তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড ধীরে ধীরে জিওব্যাগ ও কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়ায় এবং রেলওয়ের ঠিকাদাররাও কম দামের আমদানি করা পাথরের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে মধ্যপাড়ার বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত পাথর বিক্রি না হয়ে গুদামে জমে থাকতে থাকে।
তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ড আবার মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার শুরু করেছে। সরকারের নতুন ক্রয়নীতির নির্দেশনা কার্যকর হলে গুদামে জমে থাকা পাথর ধীরে ধীরে বিক্রি হবে এবং কোম্পানির দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম. শামসুল আলমও সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সরকারি প্রকল্পে মধ্যপাড়ার পাথর বাধ্যতামূলক করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, দেশে বছরে মোট পাথরের চাহিদার মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ সরবরাহ করে মধ্যপাড়া। তারপরও উৎপাদিত পাথর বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হয়, কারণ সরকারি অনেক প্রকল্পেই তুলনামূলক কম দামের আমদানি করা পাথর ব্যবহৃত হয়।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং কর ও ভ্যাটের চাপ মধ্যপাড়ার পাথরকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার পরিবর্তে টেকসই পরিচালনাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজন হলে মূল্য সমন্বয় এবং ভ্যাট ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টন পাথরের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে মধ্যপাড়া খনি বছরে মাত্র ১০ লাখ থেকে ১৩ লাখ টন পাথর উৎপাদন করে।
কোম্পানির জুন মাসের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ১৩ লাখ টন পাথর উৎপাদিত হলেও বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০ লাখ ৫০ হাজার টন। এতে আয় হয়েছে প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা।
কিন্তু উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় এই আয় প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করতে পারেনি। একই অর্থবছরে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৪২ কোটি টাকা। ফলে পরিচালন ঘাটতি হয়েছে ১৩৬ কোটি টাকা এবং কর পরিশোধের পর নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১২৪ কোটি টাকা।
অর্থবছরের মধ্যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরকের সংকটের কারণে খনিতে ১ মাস ২২ দিন উৎপাদনও বন্ধ রাখতে হয়েছিল, যা উৎপাদন ও আর্থিক অবস্থার ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির গুদামে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন বিক্রয়হীন পাথর মজুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার টন রেলওয়ের ব্যালাস্ট, ৩ লাখ ৯০ হাজার টন বোল্ডার পাথর এবং ১ লাখ ২ হাজার টন স্টোন ডাস্ট রয়েছে।
সরকারের আশা, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দেশীয় পাথরের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এই বিপুল মজুত ধীরে ধীরে বিক্রি হবে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় কমবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে এবং স্থানীয় খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু মধ্যপাড়া খনি নয়, ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও দেশীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।

