নতুন বছর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সামনে দাঁড়িয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমার মুখে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের শেষ দিকে দেশটি একটি বড় মাইলফলকে পৌঁছাতে পারে। সেটি হলো স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী নভেম্বর মাসে এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা বাংলাদেশের।
তবে এই উত্তরণ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, এলডিসি উত্তরণ তিন থেকে ছয় বছর পিছিয়ে দেওয়া হোক। সরকারের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সরকার নির্ধারিত সময়েই এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
এলডিসি উত্তরণ নিয়ে প্রস্তুতি ও আর্থসামাজিক সূচকের হালনাগাদ পরিস্থিতি মূল্যায়নে ২১ জানুয়ারি ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে উত্তরণের সামগ্রিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। দীর্ঘ আট বছরের প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়ন শেষে জাতিসংঘ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। সেই হিসাবে হাতে সময় আছে মাত্র ১১ মাস। উত্তরণ হলে দেশের রপ্তানি খাতে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ওষুধশিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীরা এলডিসি উত্তরণ পেছানোর দাবি জানাচ্ছেন। তবে এটি সরকারের একক সিদ্ধান্ত নয়। উত্তরণ পিছিয়ে দিতে হলে শক্ত যুক্তি দেখাতে হবে এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সমর্থন প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে পণ্য রপ্তানিতে কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে শর্ত আরও কঠোর হতে পারে। বিদেশি রেয়াতি ঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে এবং উত্তরণের ফলে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের সূচকে পিছিয়ে গেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বিষয়টি স্পষ্ট। তবে উত্তরণের পর রপ্তানি ও ওষুধ খাতে যে ধাক্কা আসতে পারে, তা সূচকে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন না।
এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়ে সুপারিশ করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি। তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় কোনো দেশ উত্তরণের যোগ্য কি না। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। তবে করোনার কারণে প্রস্তুতির সময় বাড়িয়ে দুই বছর দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসিভুক্ত হয়। এই মর্যাদার কারণে দীর্ঘদিন ধরে শুল্কমুক্ত রপ্তানিসহ নানা সুবিধা পেয়ে এসেছে দেশটি।
এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে রপ্তানি খাতে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকে আপাতত বড় ঝুঁকি নেই। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা না থাকলেও বড় দুই বাজারে এখনো কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। তবে ইইউর শুল্কমুক্ত সুবিধার মেয়াদ শেষে নিয়মিত হারে শুল্ক আরোপ হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়তি শুল্কের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি বছরে ৫৩৭ কোটি ডলার বা প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে ওষুধশিল্প। এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে ওষুধ খাতে মেধাস্বত্ব বিধিবিধানে কড়াকড়ি বাড়বে। বর্তমানে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য এই খাতে ছাড় রয়েছে। তবে এর আগে কোনো দেশ এলডিসি থেকে বের হলে সেই সুবিধা আর কার্যকর থাকবে না।
এ ছাড়া উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হতে পারে। কারণ, উত্তরণ–পরবর্তী দেশগুলোকে তুলনামূলকভাবে সক্ষম অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে উত্তরণের বড় ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গরিব বা স্বল্পোন্নত দেশের তকমা ঘুচবে। বাংলাদেশ পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এতে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটবে।
এই বাস্তবতায় পোশাক, ওষুধসহ রপ্তানিনির্ভর বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা এলডিসি উত্তরণ তিন থেকে ছয় বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন সভা ও সেমিনার করেছে। গত নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের সফররত প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও তাঁরা একই দাবি জানান।
এর আগে গত আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের এক সেমিনারে সংগঠনটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান উত্তরণের সময় বাড়ানোর পক্ষে পাঁচটি যুক্তি তুলে ধরেন। এগুলো হলো ভালো বাণিজ্য দর–কষাকষির সুযোগ তৈরি, তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনা, শিল্প খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জলবায়ু সহনশীলতা টেকসই করা।

