ফসলের উৎপাদন ভালো হলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ছাড়া ভোক্তা যে সুফল পায় না, তা ২০২৫ সালে আবার দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় বৈপর্য দেখা গেছে চালের বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে চালের দাম ছিল বাড়তি।
বছরজুড়ে চাল, সয়াবিন তেল ও সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। পেঁয়াজের দামও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যদিও বছর শেষে চাল, সবজি ও পেঁয়াজের দামে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চাল, পেঁয়াজ ও ভোজ্য তেলের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে মিল ও পাইকারি পর্যায়ে শক্ত নজরদারি, তথ্যভিত্তিক আমদানি নীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমবে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষভাগে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে। এর বড় অংশ খাদ্যদ্রব্যের দাম, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোক্তার অধিকার নিয়ে কাজ করা কনজ্যুমারস্ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, “২০২৫ সাল ভোক্তাদের জন্য সহনীয় ছিল না। চালের দাম বেশি ছিল। দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল ভোক্তা পায়নি। পেঁয়াজের বাজার অস্থির ছিল। সরকার পর্যাপ্ত মজুতের কথা বললেও বাস্তবে সরবরাহ কম ছিল। সময়মতো আমদানির সিদ্ধান্ত নিলে সমস্যা হতো না। সবজির বাজারও বছরের অধিকাংশ সময় চড়া ছিল। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মনিটরিং এখন জিরো। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কঠোর নজরদারি দরকার।”
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি কম:
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭–৮ শতাংশের মধ্যে নেমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশের বেশি ছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কাগজে-কলমে স্বস্তিদায়ক হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের ব্যয়-চাপে তেমন স্বস্তি আসেনি। আয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমানভাবে হয়নি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, একটি পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৫ শতাংশের বেশি খরচ হয় খাবারের ওপর। ফলে সামান্য খাদ্যদামের বৃদ্ধিও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা।
বিশ্ববাজারে চালের দাম কমলেও দেশে চড়া:
২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় বৈপর্য চালের বাজারে দেখা গেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটি মার্কেট আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের পর ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে চালের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গড় দাম বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে সেই সুফল মেলেনি। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫০–৫৫ টাকা ছিল, শেষে বেড়ে ৫৪–৬০ টাকা হয়েছে। সরু চালের দাম ৭০–৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০–৮৫ টাকায় ওঠানামা করেছে।
চাল উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও দাম না কমার পেছনে মিল পর্যায়ে সিন্ডিকেট ও বাজার তদারকির দুর্বলতা অন্যতম। মিলাররা উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কথা বললেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধান কারণ হলো বাজার তদারকির ঘাটতি। সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, খোলাবাজার বিক্রি ও আমদানির সিদ্ধান্ত থাকলেও প্রভাব সীমিত ছিল।
সয়াবিন ও পাম তেলের দাম দফায় দফায় বাড়লো:
২০২৫ সালে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম দফায় দফায় বাড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম না বাড়ালেও ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। খুচরা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। অক্টোবর মাসে সর্বশেষ দাম বাড়ানো হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে সরাসরি দৈনন্দিন খাবারের খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বড়।
পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা:
২০২৫ সালের প্রায় সারা বছর পেঁয়াজের দাম কিছুটা স্বস্তির মধ্যে ছিল। কিন্তু বছর শেষে মৌসুম শেষ ও সরবরাহ কমার কারণে দাম লাফিয়ে বেড়েছে। নভেম্বরে পেঁয়াজ কেজিতে ১৬০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। সরকার বাধ্য হয়ে আমদানির অনুমতি দেয়। ডিসেম্বরে দেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসায় দাম কমে ৬০–৭০ টাকার মধ্যে চলে আসে।
সবজির দাম বছরের অধিকাংশ সময় চড়া:
সবজির দাম ভোক্তাদের জন্য বছরজুড়ে চড়া ছিল। বেশির ভাগ সবজির দাম ৮০–১০০ টাকার মধ্যে। কিছু সবজি ১২০–১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দাম বেড়ে চাপ পড়েছে ডিম ও মুরগির ওপরও। তবে শীত মৌসুমে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে। এখন সবজি ৩০–৬০ টাকার মধ্যে, ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দামও নিম্নমুখী।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সবজির দামে সামান্য স্বস্তি খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমাতে সাহায্য করেছে। কিন্তু মৌসুমি ও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে না, যদি সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা উন্নত না হয়। তারা বলছেন, শক্ত হাতে বাজার তদারকি, সিন্ডিকেট দমন ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করবে আগামী বছরের খাদ্যবাজারের গতিপথ।
ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান মনে করিয়ে দিয়েছেন, নতুন বছরের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় নির্বাচন। নতুন সরকার আসার পর রমজান হবে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে।

