পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নতুন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর এবার একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর ওপর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রশাসকদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৫ আগস্টের মধ্যে বাকি চারটি ব্যাংক থেকেও প্রশাসকদের প্রত্যাহার করা হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এর আগে ৩০ জুলাই এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রথম প্রশাসক প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর পর্যায়ক্রমে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকেও প্রশাসকদের সরিয়ে নেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে পাঁচটি ব্যাংকের দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব পুরোপুরি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনার হাতে চলে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সময় সাময়িকভাবে প্রশাসকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের মূল কাজ ছিল ব্যাংকগুলোর ঋণ, আমানত, হিসাব এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম একীভূত করার প্রক্রিয়া সমন্বয় করা। নতুন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ায় এখন আর একই প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক রাখার প্রয়োজন দেখছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, একীভূতকরণের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশাসকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে এখন ব্যাংকের নিয়মিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকর হওয়ায় একই সঙ্গে প্রশাসক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব পালন করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সে কারণেই ধাপে ধাপে প্রশাসকদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একীভূতকরণের বড় অংশ শেষ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, পাঁচটি ব্যাংকের কার্যক্রম একত্র করে নতুন ব্যাংকের অধীনে নিয়ে আসার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। প্রশাসকদের নিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এই পরিবর্তনকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া এবং পুরোনো ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও কার্যক্রম নতুন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা।
তবে একীভূতকরণের সব কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সমন্বয় এখনও চলছে। পাঁচটি ব্যাংকের মূল ব্যাংকিং সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের হিসাব ব্যবস্থাকে একক কাঠামোর আওতায় আনার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
এ কারণে কিছু কার্যক্রম এখনো আগের ব্যাংকগুলোর নাম ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত একীভূতকরণ সম্পূর্ণ হলে ব্যাংকটির সব কার্যক্রম সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামেই পরিচালিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসকদের রেখে দিলে দায়িত্বের সীমা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোন সিদ্ধান্তে কার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকবে, তা নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই প্রশাসকদের পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন আগে সরানো হলো এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক
পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক থেকেই প্রথম প্রশাসক প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওই ব্যাংকের কার্যালয় থেকেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ কারণে এক্সিম ব্যাংকের ক্ষেত্রে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি আগে সম্পন্ন করা হয়েছে।
বাকি চারটি ব্যাংক থেকেও ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রশাসকদের প্রত্যাহার করা হবে। এরপর নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনেই একীভূত ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
পুনর্গঠনের কঠিন সময়
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান মনে করেন, ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ও প্রশাসনিক পরিবর্তন সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়। তবে দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই পুনর্গঠন সফলভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নিতে না পারলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নয়, দেশের পুরো ব্যাংক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং একীভূত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত কাঠামোকে কার্যকরভাবে একটি ব্যবস্থায় নিয়ে আসা।
কীভাবে তৈরি হলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
একীভূত হওয়ার আগে পাঁচটি ব্যাংক আলাদা ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতো। এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। অন্যদিকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পরবর্তীতে এসব ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও আমানতকারীদের স্বার্থ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরাতে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
নতুন ব্যাংকটি ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের জমা অর্থের বিপরীতে শেয়ারে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রশাসকদের প্রত্যাহার শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একটি নতুন কাঠামোর অধীনে পুনর্গঠনের পরবর্তী ধাপ। এখন নতুন ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে পারে, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং প্রযুক্তিগত একীভূতকরণ শেষ করতে পারে—তার ওপরই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।

