তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য এখনো গভীর সংকটে রয়েছে। আমানত ও তারল্য বাড়লেও একই সঙ্গে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। মূলধনের ঘাটতি অব্যাহত থাকায় ব্যাংকগুলোর মুনাফাও কমছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি।
বিশ্লেষকদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতাও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের জোগান বাড়লেও উৎপাদন ও বিনিয়োগে তার প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। আগের প্রান্তিকে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু তারল্য বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ব্যাংক খাতকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার। এ লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক-বেজড সুপারভিশন), ব্যাংক রেজুলিউশন ফ্রেমওয়ার্ক, দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ (মার্জার ও কনসোলিডেশন) এবং সুশাসন ও আইনি সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আসবে, মূলধনের ঘাটতি কমবে এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থাও বাড়বে। তবে সংস্কার কার্যক্রমে গতি না এলে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি সত্ত্বেও ব্যাংক খাতের অন্তর্নিহিত ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকবে।
বিগত আ. লীগ সরকারের সময়ে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংক খাত ছিল তীব্র সংকটে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমছিল, ডলারের বাজার ছিল অস্থির, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল অর্থনীতিতে এবং কয়েক ডজন ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এর অংশ হিসেবে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আ. লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করার উদ্যোগ নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময়ে সীমাহীন লুটপাটের কারণে এসব ব্যাংক আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য চারটি ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে-বেনামে শেয়ার ও ঋণসংক্রান্ত সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক।
তবে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষ ও কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে দায়িত্ব ছাড়েন ড. আহসান এইচ মনসুর।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি, যা আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় খেলাপি ঋণ কমিয়ে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ১৮ মাসের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
গভর্নর জানান, আগের সরকারের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে প্রায় দুই কোটি আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথম ছয় মাসে বুলেট পেমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের এক্সিটের সুযোগ দেওয়া হবে। পরবর্তী এক বছরে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন এবং অর্থঋণ আদালত আইন কার্যকর করে খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন সংসদ অধিবেশনেই এ দুটি আইন পাস হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক খাত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সর্বাধিক খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ, যা প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বেসিক ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৬৫ শতাংশ। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৮ থেকে ৪১ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং বিডিবিএলের প্রায় ৩৯ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে সোনালী ব্যাংকের অবস্থান কিছুটা ভালো হলেও তাদের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ টাকার অঙ্কে উল্লেখযোগ্য। শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণই ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়া শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
সামগ্রিকভাবে দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ থেকে ৭৪ শতাংশ শীর্ষ ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক এবং বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখতে সক্ষম হওয়ায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
অর্থ তুলতে না পারা অনেক আমানতকারী আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই তারা ব্যাংকে অর্থ জমা রেখেছেন। অথচ প্রয়োজনের সময় নিজের অর্থ তুলতে পারছেন না। বারবার ব্যাংকে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। আর্থিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পেরে সামাজিকভাবেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে তারা সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে। প্রথমেই খেলাপি ঋণের কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি এবং অন্যান্য দুর্বলতা দূর করা জরুরি। তা না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতের সংকট বহুমাত্রিক। তাই শুধু একটি সমস্যা সমাধান করলেই হবে না। কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সব দুর্বলতা দূর করতে হবে। সুস্পষ্ট নীতিমালা ছাড়া তড়িঘড়ি করে ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত কার্যকর সমাধান হতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পর্যায়ক্রমে মার্জারের আওতায় আনা হবে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে পৃথক কৌশল গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে পাঁচটি ব্যাংক মার্জারের আওতায় আনা হয়েছে, সেই প্রক্রিয়া সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দুর্বল ব্যাংককেও একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: ভিওডি বাংলা

