২০২৫ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মূলত সৌদি আরবের শ্রমবাজারে কর্মীর চাহিদা অব্যাহত থাকায় জনশক্তি রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১১.২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বছর ১১.২৫ লাখেরও বেশি কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশ গেছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, এই ঊর্ধ্বগতি রেমিট্যান্স প্রবাহকেও শক্তিশালী করেছে। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে এসেছে ২৯.৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। আশা করা হচ্ছে, ডিসেম্বর শেষে প্রবাসী আয় প্রথমবারের মতো ৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ দেশের বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর ফলে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ৩২.৮০ বিলিয়ন ডলারে ধরে রাখতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী, গত নভেম্বরে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.১১ বিলিয়ন ডলারে, যা এক বছর আগে ছিল ২১.৩৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রবাসী আয়ের ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা স্পষ্ট। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই পরিসংখ্যান একই সঙ্গে খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাও তুলে ধরেছে। বিশেষ করে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, সৌদি আরবগামী স্বল্প দক্ষ কর্মীদের বেতন এখনো অগ্রহণযোগ্যভাবে কম। তিনি বলেন, “বেতন কাঠামো এখনো ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের কর্মীদের জন্য ভালো আয় নিশ্চিত করতে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় সরকার এখনও সফল হয়নি।”
শামীম আহমেদ বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বড় আকারে নেওয়া এবং ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত বাজারে জনশক্তি রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কৌশলগত পরিবর্তন না হলে রেকর্ড জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ সত্ত্বেও বাংলাদেশ কম মজুরির অভিবাসন চক্রে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবের আধিপত্য:
২০২৫ সালেও প্রধান গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। মোট নিয়োগ পাওয়া কর্মীর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি—৭ লাখ ৫০ হাজার ৯৬৭ জন—দেশটিতে গেছেন। শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যের মধ্যে সৌদি আরবের পরে রয়েছে কাতার (১ লাখ ৭ হাজার ৩৯৭ জন), সিঙ্গাপুর (৭০ হাজার ৪ জন), কুয়েত (৪২ হাজার ৬৫৭ জন) ও মালদ্বীপ (৩৯ হাজার ৯৭০ জন)। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গন্তব্যে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৩ হাজার ৬৯০ জন), জর্ডান (১২ হাজার ২২৯ জন), কম্বোডিয়া (১২ হাজার ১২৩ জন), ইতালি (৯ হাজার ২৯৭ জন) ও কিরগিজস্তান (৬ হাজার ৬৫০ জন)।
২০২৪ সালে সৌদি আরব একক দেশে ৬ লাখ ২৮ হাজার কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল। ২০২৫ সালে সংখ্যা আরও বেড়ে বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা আরও দৃঢ় হয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—যদি কোনো কারণে সৌদি আরবের বাজার বন্ধ হয়, তবে আমাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিপর্যয় হবে। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মালয়েশিয়ার মতো অন্যান্য বড় বাজারও এখনো পুনরায় খুলতে পারিনি।”
কর্মীদের দক্ষতায় সামান্য পরিবর্তন:
দক্ষ অভিবাসন উৎসাহিত করার নীতিগত প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে স্বল্প-মজুরি ও নিম্নমানের কাজের আধিক্য বজায় ছিল। বিএমইটির তথ্যানুযায়ী, ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশগামী কর্মীদের ৪৩.৪৭ শতাংশ ছিলেন স্বল্প দক্ষ, ৩৪.৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ, ১৯.১৩ শতাংশ দক্ষ এবং মাত্র ২.৯৪ শতাংশ পেশাদার। মোট ৭৭ শতাংশেরও বেশি কর্মী স্বল্প দক্ষ ও আধা-দক্ষ। ২০২৪ সালে একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। সে বছর স্বল্প দক্ষ কর্মীর সংখ্যা ৫৪.২৩ শতাংশ ছিল, যা ২০২৩ সালের ৫০ শতাংশের চেয়ে বেশি। দক্ষ কর্মীর হার ২৩.৬২ শতাংশ এবং পেশাদার ৪.৫৯ শতাংশ।
নারী অভিবাসনে ধীরগতি: ২০২৫ সালে নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার হার বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় ৫৫ হাজার নারী গিয়েছিলেন; ২০২৫ সালে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯৯৭। ইতিবাচক হলেও মোট অভিবাসীর তুলনায় সংখ্যা এখনও নগণ্য। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, কাজের বৈচিত্র্যহীনতা ও গন্তব্য দেশগুলোর বিধিনিষেধ নারীদের পিছিয়ে রাখছে।
আগামীর নীতিগত চ্যালেঞ্জ:
২০২৫ সালে অভিবাসনের সংখ্যা ১১.২ লাখ ছাড়ানোর পর নীতিনির্ধারকদের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন কাজের মান উন্নত করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সনদ, ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চ-মজুরি ও মানসম্মত পেশা নিশ্চিত করতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন কেবল সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে ১৩.০৫ লাখ এবং ২০২২ সালে ১১.৩৫ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত, ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ধারা বজায় থাকলে মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ কমে যাবে, মাথাপিছু রেমিট্যান্স আয় কমবে এবং প্রবাসী কর্মীরা বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

