প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাক্কলিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে সরকারি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে এই বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিপুল পরিমাণ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেলে এর চাপ পড়বে নিট রপ্তানি আয়ের ওপর। নিট রপ্তানি কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে পড়ে এবং প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে যে নীতির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটিই সাময়িকভাবে প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা কমিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিকে ‘প্রবৃদ্ধির গোলকধাঁধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এমন এক জটিল অবস্থায় আছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগই আবার প্রবৃদ্ধি কমার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তার মতে, এই অবস্থাকে গোলকধাঁধার ফাঁদ বলা যায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর কার্যকর কৌশল গ্রহণ করাও জরুরি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেটের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণে সরকার মূলত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্প। বাংলাদেশ যেহেতু ভারী যন্ত্রপাতি ও উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে না, তাই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে ডলারে আমদানি করতে হয়। এই আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে নিট রপ্তানির হিসাব নেতিবাচক হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন, অন্যদিকে আমদানি ব্যয়ের চাপ—এই দুইয়ের কারণে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা অনেক সময় উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিতে জিডিপি নির্ধারণ করা হয় চারটি উপাদানের মাধ্যমে—ব্যক্তিগত ভোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় এবং নিট রপ্তানি। নিট রপ্তানি হলো রপ্তানি আয় থেকে আমদানি ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে। আমদানি বেশি হলে এই অংশ নেতিবাচক হয়ে যায়, যা মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়।
একটি সহজ উদাহরণে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়—ধরা যাক কোনো দেশে ভোগ ও বিনিয়োগ মিলিয়ে ১০০ টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম রয়েছে। রপ্তানি ২০ টাকা এবং আমদানি ১০ টাকা হলে নিট রপ্তানি দাঁড়ায় ১০ টাকা। ফলে মোট জিডিপি দাঁড়ায় ১১০ টাকা কিন্তু আমদানি বেড়ে ৩০ টাকা হলে এবং রপ্তানি অপরিবর্তিত থাকলে নিট রপ্তানি দাঁড়ায় মাইনাস ১০ টাকা। তখন মোট জিডিপি কমে ৯০ টাকায় নেমে আসে।
বাজেট পুস্তিকার সঙ্গে দেওয়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতেও এই ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। তবে এই বিনিয়োগ বাস্তবায়নে বিপুল মূলধনি পণ্য আমদানি করতে হবে।
এতে আমদানি প্রবৃদ্ধি রপ্তানি প্রবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়বে, যার ফলে নিট রপ্তানির ওপর চাপ তৈরি হবে। এর কারণে প্রতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নীতি বিবৃতির এই বিশ্লেষণ পর্যালোচনায় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর যে কৌশল নেওয়া হচ্ছে, সেটিই আবার প্রবৃদ্ধি কমার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই এটিকে ‘প্রবৃদ্ধির গোলকধাঁধা ফাঁদ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একে ফাঁদ বলতে রাজি নন। তাঁদের মতে, এটি একটি সাময়িক রূপান্তরকালীন পরিস্থিতি, যাকে উন্নয়নের ‘প্রসববেদনা’ হিসেবে দেখা উচিত। তাঁদের দাবি, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে এই বিনিয়োগই প্রবৃদ্ধি বাড়াবে।
সরকারের তিনটি কৌশল: এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তিনটি কৌশল নিয়েছে—
- অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা
- রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো
- প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়িয়ে সরকারি বিনিয়োগের সুফল উৎপাদন খাতে নিশ্চিত করা
মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, এই জটিলতা থেকে বেরোতে হলে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। এতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, যা প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, চামড়া, নির্মাণ উপকরণ, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল খাতের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে নীতি সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

