বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো আবার চালুর বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। আগামী শনিবার, ২০ জুন এই বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল রবিবার (১৪ জুন) শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বেঞ্জামিন রিয়াজী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বৈঠকটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
চলতি বছরের বাজেটে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ঘোষিত বাজেটে এ খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়। অর্থনীতির এই সিদ্ধান্তকে দৃঢ় অবস্থান হিসেবে তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বন্ধ চিনিকল চালুর পরিকল্পনায় সরকার অনড় রয়েছে। তাঁর প্রত্যাশা, আগামী অর্থবছরেই এসব কারখানা আবার উৎপাদনে ফিরবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্ধ চিনিকল চালুর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এ কাজে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারখানাগুলোর অব্যবহৃত জমিতে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতসহ অন্যান্য শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বিনিয়োগকারীরা চিনিকল খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে জানা যায়।
২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ছয়টি বন্ধ করে দেয়। বন্ধ হওয়া মিলগুলো হলো শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর চিনিকল। তখন লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আধুনিকায়নের অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। বন্ধ হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার শ্রমিক ও আখচাষি সংকটে পড়েন। অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েন।
শ্রমিক আকতার হোসেন বলেন, “আমরা এখনো কোনো কাজ পাইনি। চিনিকল চালু হলে আমাদের মতো শ্রমিকদের জীবন আবার স্বাভাবিক হতে পারে। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে গেছে।” পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করে বন্ধ চিনিকল চালুর সুপারিশ দেয়। একই সঙ্গে নতুন জনবল নিয়োগের কথাও বলা হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরেই বন্ধ কারখানার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন।
টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম ধাপে সেতাবগঞ্জ ও শ্যামপুর চিনিকল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর জন্য যথাক্রমে ৮২৩ কোটি ও ৫৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মেলেনি। জানুয়ারিতেও একই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে আবারও বন্ধ চিনিকল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির পঞ্চগড়ে আখচাষিদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বলেন, আখচাষি, শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক পরিচালনাই সরকারের অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত এসব শিল্প দেশের সম্পদ। এগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফেরানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সরকারের লক্ষ্য। একই সঙ্গে আখ উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকদের সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
মন্ত্রী জানান, দেশে চিনি উৎপাদন কমে গেছে। বর্তমানে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশে প্যাকেটজাত করা হয়। তিনি বলেন, শুধু কারখানা চালু করলেই হবে না, আখচাষিদেরও সহায়তা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, কিছু ক্ষেত্রে বন্ধ কারখানার জায়গায় বিকল্প শিল্প স্থাপনের বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে। এর মধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের কয়েকটি দল ইতোমধ্যে এসব কারখানা পরিদর্শন করেছে বলেও তিনি জানান। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ২০১২ সালের পর নতুন জনবল নিয়োগ হয়নি। ২০২০ সালে ছয়টি চিনিকল বন্ধ হওয়ার পর জনবল অন্য মিলগুলোতে স্থানান্তর করা হলেও সবাই কাজ পাননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমানে পুরো ব্যবস্থায় প্রায় ছয় হাজার জনবল রয়েছে, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ১৭ হাজার জনবলের। তিনি মনে করেন, বন্ধ মিলগুলো চালু হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং অনেকেই কাজে ফিরতে পারবেন।

