নতুন বছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য এসেছে মনখারাপের খবর। সরকার আবারও সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে যাঁরা নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনবেন, তাঁরা মেয়াদ শেষে গড়ে সাড়ে ১০ শতাংশের মতো মুনাফা পাবেন। এতদিন যেখানে এই হার ছিল প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে এবার তা বেশ খানিকটা কমে গেল।
বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে। নতুন সুদহার কার্যকর হবে আগামী ছয় মাস—অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত কেনা সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, আগের সময়ে যাঁরা সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, তাঁদের জন্য পুরোনো সুদহারই বহাল থাকবে।
কেন কমছে সঞ্চয়পত্রের সুদ?
একসময় সঞ্চয়পত্রের সুদহার বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকলেও গত বছরের জানুয়ারি থেকে সরকার এই নীতিতে পরিবর্তন আনে। এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা নির্ধারণ করা হয় সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। মূলত পাঁচ বছর ও দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সর্বশেষ ছয় মাসের গড় নিলাম সুদহারকে ভিত্তি ধরা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার কমে আসায় তার প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়পত্রেও। এর ধারাবাহিকতায় গত জুলাই–ডিসেম্বর সময়ের জন্যও সুদহার সামান্য কমানো হয়েছিল। নতুন বছরের শুরুতে এসে সেই কমার ধারা আরও স্পষ্ট হলো।
দেশে কী কী সঞ্চয় স্কিম চালু আছে?
বর্তমানে দেশে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এর পাশাপাশি ডাকঘরের মাধ্যমে চালু আছে পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিট নামে একটি সরকারি সঞ্চয় স্কিম। প্রতিটি স্কিমেই সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের জন্য এক ধরনের সুদহার এবং এর বেশি বিনিয়োগের জন্য তুলনামূলক কম সুদহার নির্ধারণ করা হয়। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন।
তবে সঞ্চয়পত্রের বাইরে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সাধারণ হিসাব এবং প্রবাসীদের জন্য চালু থাকা তিন ধরনের বন্ডে সুদহার আপাতত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
কোন সঞ্চয়পত্রে কত মুনাফা মিলবে?
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এখন থেকে কেনা পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকা বা তার কম বিনিয়োগ করলে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ হারে। আগে এই হার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা নেমে আসবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশে।
তিন বছর মেয়াদি, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে এখন মুনাফা হবে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগে পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আগে এই দুই ক্ষেত্রে সুদহার ছিল যথাক্রমে ১১ দশমিক ৮২ ও ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
পেনশনারদের জন্য চালু পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রেও সুদ কমানো হয়েছে। সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফা এখন ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা আগে ছিল প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। এর বেশি বিনিয়োগে মুনাফা দাঁড়াবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশে।
একইভাবে পরিবার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রেও সুদহার কমেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফা হবে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগে এই হার নেমে এসেছে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশে।
পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিট হিসাবেও একই চিত্র। তিন বছর মেয়াদি এই ডিপোজিটে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফা মিলবে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ হারে। আগে এসব স্কিমে সুদহার ছিল ১১ শতাংশের ওপরে।
মেয়াদ পূর্তির আগে টাকা তুললে কী হবে?
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত মেয়াদের আগেই যদি সঞ্চয়পত্র বা ডিপোজিট ভাঙানো হয়, তাহলে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বছর শেষে তুলনামূলক কম হারে মুনাফা দেওয়া হবে। আর যেসব সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ চলাকালে নিয়মিত মুনাফা দেওয়া হয়, সেসব ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে মূল টাকার সঙ্গে হিসাব করে চূড়ান্ত সমন্বয় করা হবে।
সব মিলিয়ে, নতুন বছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রে সুদ কমায় মধ্যবিত্ত ও নির্ভরশীল বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি হতাশার খবর। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত এই স্কিমে এখন আগের মতো আকর্ষণীয় মুনাফা না থাকায় অনেকেই বিকল্প বিনিয়োগের কথা ভাবতে পারেন—যা আগামী দিনে সরকারের সঞ্চয় নীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।

