২০২৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল, ঘটনাবহুল বছর হিসেবে চিহ্নিত হলো। সামনে ২০২৬ সাল নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এসেছে, তবে সঙ্গে আছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাহাড়। দেশের মন্থর অর্থনীতি ও অনিশ্চিত রাজনীতি এই বছরকে ‘মেক অর ব্রেক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ঘটনা ছিল ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যু। তার আগের মাসে, আগস্ট ২০২৪-এ গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই সময়েই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর এমন একটি নির্বাচন হচ্ছে প্রথম, যেখানে গত চার দশক ধরে রাজনৈতিক প্রভাবশালী দুই নেতা—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—কেউই নেই।
একই সময়ে উঠেছে ‘মবোক্র্যাসি’ নামে পরিচিত সহিংসতা, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ধ্বংস, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যা। লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরা—এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালের রাজনৈতিক ইতিহাস গড়ে উঠেছে।bনতুন বছরটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আশায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক রূপান্তর নয়, দেশের অসুস্থ অর্থনীতির জন্যও ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৬ সাল কার্যত নির্বাচনী বছর। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়ে শুরু, এরপর সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পালা। রাজনৈতিক রূপান্তরের জন্য এটি একটি সুযোগসন্ধানী বছর। তবে ভবিষ্যতের সুর নির্ধারণ করবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনই।
একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতি ও অর্থনীতির সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনও তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হবে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ইতোমধ্যেই দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অব্যর্থ উত্থান ক্ষমতার দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর একটিতে পরিণত হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এনসিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় নির্বাচনের ঝুঁকি ও গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে বিএনপিকে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিতে আসা তারেক রহমানের পাশে এবার নেই তার মা খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সাল থেকে তার অসীম নেতৃত্বে বিএনপি নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়েছে। লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত খালেদা জিয়ার মৃত্যু ভোটারদের মধ্যে সহানুভূতির আবহ সৃষ্টি করতে পারে, যা জামায়াত জোটের বিপক্ষে তারেক রহমানের লড়াইয়ে সহায়ক হবে।
অর্থনীতি ও নির্বাচনের প্রত্যাশা:
২০২৫ সালের শেষ দিকে কিছুটা স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা গেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকায় বৈদেশিক ভারসাম্য উন্নত হয়েছে এবং মুদ্রার চাপ কিছুটা কমেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার এখনও ভঙ্গুর। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ানোর ধাক্কা বাংলাদেশ সামলাতে পেরেছে, পরে তা ২০ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে ভারত ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে সুবিধা ক্ষয় করছে।
ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান দুর্বল, আস্থা কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপে অবনতি কিছুটা থেমেছে, তবে ব্যাংকিং খাত এখনও চাপে। মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি। তারল্য সংকটে ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে পারছে না। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করলে ব্যাংকিং সুশাসনে পরিবর্তন আসতে পারে।
রাজস্ব ব্যবস্থাও চাপের মধ্যে। কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশে আটকে। সংস্কার থেমে থাকায় সরকার নিয়মিত ব্যয় ও নির্বাচন-সংক্রান্ত খরচ মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি নিরাপত্তা দূর্বল। কিছু উন্নতি আছে—নবায়নযোগ্য জ্বালানি চুক্তি ও ২০২৬ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক চালুর সম্ভাবনা। তবু দেশ এখনো আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশে নেমেছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও এখনো উচ্চ এক অঙ্কে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে স্ট্যাগফ্লেশন হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি দুর্বল, ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং কর্মসংস্থান স্থবির।
এই প্রেক্ষাপটে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আস্থা ফিরিয়ে আনবে, বিনিয়োগের দ্বার খুলবে এবং পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করবে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইক টাচটনের গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণা দেখায়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয়ী যেই হোক না কেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স শক্তিশালী হয়। কারণ এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও নীতির পূর্বানুমেয়তার বার্তা দেয়—যা বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য বার্তা স্পষ্ট—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখন শুধুমাত্র রাজস্ব বা মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করছে না, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা উদ্বেগের বিষয়। তবে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন শান্ত পরিবেশ নির্বাচন কমিশনকে আশাবাদী করেছে। ব্যবসায়ী ও সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষ আশা করছেন, নির্বাচন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ফিরে আসবে।
আশার আরেকটি কারণ—বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে তিনটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনগুলো ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের মাইলফলক। আসন্ন নির্বাচন চতুর্থ। ১৯৭৯ সালের নির্বাচন সামরিক আইন পর্বের অবসান ঘটিয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচন প্রথম সত্যিকারের বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিতর্কিত হলেও সংবিধান সংশোধনের পথ খুলেছে এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। গেল ৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আশ্বাস দিয়েছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হবে। “এই নির্বাচন সেই নতুন বাংলাদেশের দরজা খুলে দেবে।”
এখন দেখার বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে ধাত্রী হিসেবে ভূমিকা পালন করে, যাতে জন্মপ্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে, গণভোটের ফলাফল—‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—ও জুলাই সনদের বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এতে নতুন সংসদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কারের পথ খুলবে। সব মিলিয়ে, ২০২৬ কেবল নির্বাচনের বছর নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য সত্যিকারের ‘মেক অর ব্রেক’ বছর।

