বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের কাপড়, পোশাক ও এক্সেসরিজ স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যাপক তদারকি ও কঠোর অভিযান শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ অভিযানের অংশ হিসেবে প্রায় ১০০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এনবিআরের নজরদারির লক্ষ্য, বন্ড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে তা রপ্তানির বদলে খোলাবাজারে বিক্রি করা। রাজস্ব কর্তৃপক্ষ গত পাঁচ বছরের ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহ করছে সন্দেহভাজন বড় রপ্তানিকারকদের।
কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য কাস্টমসের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’ ও অন্যান্য ডেটাবেজে থাকা আমদানি-রপ্তানি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এ প্রক্রিয়ায় অমিল বা অসঙ্গতি ধরা পড়লে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে, বন্ড কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে নতুন বছরের প্রথম দিন, ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরনের ম্যানুয়াল ইউটিলিটি পারমিট বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে বন্ড সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম ডিজিটাল কমপ্লায়েন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কাঁচামালের এনটাইটলমেন্ট বা ইউটিলিটি পারমিশনসহ সব বন্ড সেবা কেবল ‘কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (সিবিএমএস)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কর্মকর্তারা জানান, সিবিএমএস বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমসের ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় নজরদারি, অডিট ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ অনেক শক্তিশালী হবে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, “বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আর সহ্য করা হবে না। বন্ড অটোমেশন এখন পুরোপুরি বাধ্যতামূলক। আমরা নিয়মিতভাবে বন্ডেড ওয়্যারহাউজে ইনভেন্টরি চেক করব। যে কাঁচামাল থাকার কথা, তা যদি বাস্তবে না পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে মামলা করা হবে। কারণ ওই কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে।” এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় ৬ হাজার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স রয়েছে। এরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করতে পারে।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প:
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দেশের টেক্সটাইল মিল মালিকরা। তারা অভিযোগ করেন, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি ও চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য প্রবেশ করছে। এতে স্থানীয় উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। গার্মেন্টস এক্সেসরিজসহ অন্যান্য পণ্যও এ অপব্যবহারের আওতায় পড়ছে।
স্থানীয় শিল্প মালিকরা আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে এনবিআরের দুটি ভাগ হওয়ার পর প্রশাসনিক জটিলতায় মাঠ পর্যায়ে তদারকি কমে যাওয়ায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বেড়েছে। টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেন, এই খাতে বিনিয়োগ করা ২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় বিনিয়োগ হুমকির মুখে রয়েছে।
বন্ড সুবিধা ও এর অপব্যবহার:
সরকার রপ্তানিকারকদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয়। শর্ত হলো, কাঁচামাল নির্ধারিত ওয়্যারহাউজে রেখে পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করতে হবে। স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হলে কাস্টমসের অনুমতি নিতে হবে এবং প্রযোজ্য আমদানি কর দিতে হবে। কাঁচামাল ভেদে আমদানি করের হার ৪০ থেকে ৮৯ শতাংশ।
১৯৮০-এর দশক থেকে এই সুবিধা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে এক শ্রেণির অসাধু রপ্তানিকারক কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে স্থানীয় শিল্পের জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছেন। এতে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে এবং দেশীয় শিল্প বিনিয়োগ হুমকিতে পড়ছে। সঠিক পরিসংখ্যান নেই, তবে ২০১৬ সালে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান জানিয়েছিলেন, এ ধরনের অপব্যবহারের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ব্যাংক হিসাব যাচাই:
অভিযানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন কর অফিস দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং তথ্য চেয়েছে। এনবিআরের ৩০টি কর অঞ্চলের বেশিরভাগ অফিস ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে।
ঢাকা কর অঞ্চল-৮-এর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের অফিস থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে ব্যাংকের কাছে অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। বড় আকারের, কয়েক কোটি টাকা বন্ড মিসইউজের সন্দেহ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।”
তথ্য পাওয়ার পর কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা সফটওয়্যারের সঙ্গে ক্রসচেক করা হবে। ব্যাংকে লেনদেনের পরিমাণ রপ্তানির তথ্যের তুলনায় বেশি হলে এবং ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে ধরে নেওয়া হবে, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবও যাচাই করা হবে।
কর অঞ্চল-১৫-এর এক কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যাংকে চাওয়া হয়েছে। অন্য কর অফিস মিলিয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১০০। তবে দুই কর অফিস নাম প্রকাশে রাজি হয়নি। সূত্র জানিয়েছে, তালিকায় থার্ম্যাক্স গ্রুপের অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া:
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গত মাসে এনবিআরের সঙ্গে বৈঠকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, “অপরাধী প্রকাশ্যে শাস্তি পাবে, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা হয়রানি থেকে মুক্তি পায়। আমরা জানতে চাই, কারা বন্ড সুবিধা অপব্যবহার করছে।”
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) কমিটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের ফ্যাব্রিক ও পোশাকের চাহিদার মধ্যে স্থানীয় মিলগুলো সরবরাহ করে ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বাকী ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সুতা, কাপড় ও পোশাক বন্ড মিসইউজ বা চোরাচালানের মাধ্যমে আসে। এতে অনেক মিল তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছে।
তিনি বলেন, “এনবিআরের উদ্যোগ অনিয়ম কমাতে সহায়ক হবে। তবে ফল পেতে হলে সিস্টেম ও কর্মকর্তাদের দক্ষ হতে হবে।” বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সতর্ক করে বলেন, “কিছু অপব্যবহারকারীর জন্য পুরো ব্যবসায়ী সমাজ দায়ভার নেবে না।”

