দেশের দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে প্লাস্টিক শিল্পে। শিল্পমালিকদের দাবি, জ্বালানি ঘাটতির কারণে অনেক কারখানাই এখন স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন অব্যাহত রাখা, ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ছাদের সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং একটি অলাভজনক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক এক সেমিনারে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই দাবি তুলে ধরেন। তাদের মতে, প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসে বিনিয়োগের এখনই উপযুক্ত সময়।
সমিতির সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, প্লাস্টিক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল প্লাস্টিক হলেও বিদ্যুৎ ছাড়া কোনো কারখানাই সচল রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু টানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও কারখানাগুলো প্রায় ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল বলে জানানো হলেও বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নেই। অনেক কারখানাই ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় পৌঁছাতেও হিমশিম খাচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্যাস সংকট শুরুর পর থেকেই এই পরিস্থিতি চলছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো একাধিকবার সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। কারণ নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে শিল্প উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং পরিবেশসম্মত উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, শিল্পায়নের বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপও বাড়ছে। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
সেমিনারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে দিনের বেলায় জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এতে বিদ্যুতের বিল কমার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকিও কমবে, যা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে জ্বালানির বাড়তি খরচ এবং জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে শিল্পকারখানাগুলো আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে। ছাদের সৌরবিদ্যুৎ এই চাপ অনেকটাই কমাতে পারে। সঠিক পরিকল্পনায় নির্মিত শিল্প ভবনের ছাদে নিরাপদভাবেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব বলেও তারা জানান।
প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত, বিদ্যুৎ বিনিময়ভিত্তিক অথবা সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বেছে নিতে পারে। তবে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ সুবিধাসম্পন্ন ব্যবস্থা বিদ্যুৎ না থাকলেও সরবরাহ বজায় রাখতে সক্ষম হলেও এর ব্যয় তুলনামূলক বেশি।
সমিতির নেতারা মনে করেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছাদের সৌরবিদ্যুৎই সবচেয়ে কার্যকর ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সঠিক নকশা, দক্ষ কারিগরি সহায়তা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। শুরুতে ছোট পরিসরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ধীরে ধীরে তা সম্প্রসারণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ নির্ভুলভাবে পরিমাপ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব এবং অর্থ পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন, যাতে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহ পান।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, তৈরি পোশাক শিল্প ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্লাস্টিক শিল্পেও এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আরও কার্যকর হবে বলে মত দেন বক্তারা।
শিল্পমালিকদের মতে, বর্তমান জ্বালানি সংকট শুধু উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে না, রপ্তানি সক্ষমতা ও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তাই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোই হতে পারে দেশের শিল্পখাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রাখার অন্যতম কার্যকর পথ।

