বিশ্ব একদিকে যুদ্ধের অস্থিরতা, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়াই করছে। কোথাও ভয়াবহ দাবানল, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এমন এক সময়েই বিশ্বের সবচেয়ে বড় আটটি জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র তিন মাসে প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৯৩০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ব যখন সংকটে, তখন এই বিপুল আর্থিক লাভের দায় ও দায়িত্ব কতটা বহন করবে এসব প্রতিষ্ঠান?
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সৌদি আরামকো, বিপি, শেল, ইকুইনর, টোটালএনার্জিস, এনি, শেভরন ও এক্সনমবিল—এই আটটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দ্বিতীয় প্রান্তিকের মুনাফা প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার। এটি সেই প্রথম পূর্ণ আর্থিক প্রান্তিক, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারেরও বেশি উঠে যায়।
বিশ্ববাজারে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু কোম্পানিগুলোর আয় বাড়ায়নি, বরং জ্বালানি ব্যয়ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।
পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, যুদ্ধ এবং জলবায়ু সংকটের ফলে যে মানবিক দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে, তার আর্থিক সুবিধা পেয়েছে তেল কোম্পানিগুলো। তাদের মতে, এই অতিরিক্ত মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারে ব্যয় করা উচিত।
পরিসংখ্যান আরও বলছে, এক বছর আগে একই সময়ে এই আটটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মুনাফা ছিল ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও কম। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তাদের আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শুধু মুনাফাই নয়, একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্যও প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩ ট্রিলিয়ন, অর্থাৎ তিন লাখ কোটি ডলারেরও বেশি হয়েছে।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই আটটি প্রতিষ্ঠান গড়ে প্রতি মিনিটে ৭ লাখ ডলারেরও বেশি মুনাফা করেছে। অর্থাৎ বিশ্ব যখন তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন জ্বালানি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রথমবারের মতো দেখানো হয়, বিশ্বের বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্বন নিঃসরণ সরাসরি প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় বলা হয়, শীর্ষ ১৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির নিঃসরণ এমন ৫০টিরও বেশি তাপপ্রবাহের জন্য যথেষ্ট, যা অন্যথায় প্রায় অসম্ভব ছিল।
সবচেয়ে বেশি লাভ করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো। ইরানি ও হুথি বাহিনীর ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অবকাঠামোর ক্ষতি হলেও কোম্পানিটির দ্বিতীয় প্রান্তিকের নিট আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে।
কার্বন মেজরস নামের তথ্যভাণ্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আরামকো। এর পরেই রয়েছে শেভরন ও এক্সনমবিল। এছাড়া শেল ও বিপি-ও শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে। জলবায়ু নীতিমালা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিলম্ব বা বাধা সৃষ্টির অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে।
এদিকে বিপি জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তাদের ত্রৈমাসিক মুনাফা হয়েছে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের তিন মাসের ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির জন্য এটি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ মুনাফা।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, এই বিপুল আয় শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়; এটি বৈশ্বিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি। তাদের ভাষ্য, সাধারণ মানুষ যখন বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের বোঝা বহন করছে, তখন বড় তেল কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের লাভ বাড়াতেই বেশি মনোযোগী।
পরিবেশকর্মীদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় তেল কোম্পানিগুলোর আর্থিক দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, ন্যায্য কর আদায় এবং সেই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্যা প্রতিরোধ, দাবানল মোকাবিলা ও পরিবেশ পুনর্গঠনে ব্যয় করা হলে দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব উপকৃত হবে।
অন্যদিকে শেল দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৯ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক আয়। কাতারের গ্যাসক্ষেত্র যুদ্ধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই আয় অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে ইকুইনরের মুনাফা বেড়ে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি থেকে শেভরন ও এক্সনমবিল অতিরিক্ত লাভ করেছে এবং সেই মুনাফার একটি অংশ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। দ্বিতীয় প্রান্তিকে শেভরনের নিট মুনাফা বেড়ে ১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং এক্সনমবিলের মুনাফা দ্বিগুণ হয়ে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এদিকে জলবায়ু সংকটের বাস্তব চিত্রও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইউরোপে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। আর বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জুলাইয়ের শুরুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কোম্পানিগুলোর আয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে একই নির্ভরশীলতা জলবায়ু সংকটকে আরও গভীর করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু মুনাফা নয়, টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তরই হতে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েলও একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এখন বিশ্বের বহু অঞ্চলে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটানোর পাশাপাশি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক এই আর্থিক ফলাফল শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাভের হিসাব নয়; বরং এটি এমন এক বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজার, অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

