২০২৫ সালের শেষে বৈশ্বিক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সম্পদের আকার রেকর্ড ৬০ ট্রিলিয়ন বা ৬০ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সভরেইন ওয়েলথ ফান্ড, সরকারি পেনশন তহবিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীরাই এই সম্পদের ব্যবস্থাপনা করছে।
গবেষকরা দেখাচ্ছেন, এই বিনিয়োগের সিংহভাগই গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। গত বছর দেশটি বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের প্রধান গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ডিজিটাল অবকাঠামো, ডাটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অন্যদিকে, বড় উদীয়মান বাজারগুলো থেকে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কমেছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল এসডব্লিউএফের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীদের মোট সম্পদ ২০২৫ সালে রেকর্ড ৬০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সভরেইন ওয়েলথ ফান্ড ও সরকারি পেনশন তহবিলগুলো গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এটি সংশ্লিষ্ট সংস্থার মোট বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেক।
সভরেইন ওয়েলথ ফান্ডের দুই-তৃতীয়াংশ বিনিয়োগই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে গিয়েছে। বিপরীতে বড় উদীয়মান বাজারগুলোতে বিনিয়োগ কমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে। গ্লোবাল এসডব্লিউএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়েগো লোপেজ বলেছেন, “বিদেশি বিনিয়োগগ্রহণকারী দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল অবকাঠামো, ডাটা সেন্টার ও এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে।”
প্রকাশ্য তথ্য ও সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্লোবাল এসডব্লিউএফ এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন তহবিল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ও ব্যয়ের হিসাব অন্তর্ভুক্ত আছে। গত বছর শুধু সভরেইন ওয়েলথ ফান্ডের সম্পদই ট্রিলিয়ন ডলারে রেকর্ড গড়েছে। মোট বিনিয়োগ ৩৫ শতাংশ বেড়ে ১৭ হাজার ৯৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বাড়ার প্রভাব পড়েছে উদীয়মান বাজারে। যদিও ২০২৫ সালে এসব বাজারের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো ছিল। লোপেজ লিখেছেন, “রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রমুখী হওয়ায় চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে এই দেশগুলো আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম বিনিয়োগ পেয়েছে। মোট বিনিয়োগের মাত্র ১৫ শতাংশ গেছে এসব বাজারে।” তবে উদীয়মান দেশগুলো প্রাইভেট ক্রেডিট ইনভেস্টমেন্টে নতুনভাবে আগ্রহী হয়েছে। তুলনামূলক বেশি রিটার্ন ও সুবিধাজনক প্রকল্প কাঠামোর কারণে এই বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২৫ সালে নতুন ১১টি সভরেইন ওয়েলথ ফান্ড গঠিত হয়েছে, সবই উদীয়মান দেশ থেকে এসেছে। তবে জ্বালানি তেলের দামের পতনের কারণে বড় বিনিয়োগকারীদের মূলধনপ্রবাহের ধরণ ২০২৬ সালে পরিবর্তন হতে পারে। সৌদি আরব ইতিমধ্যেই ব্যয় পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা করছে। লোপেজের মতে, “আয়ের উৎস নির্ধারণ করবে নতুন মূলধনের প্রবাহ। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল ফান্ডের জন্য ২০২৬ কঠিন হতে পারে। তবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তামার মতো ধাতু নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে।”
রাষ্ট্রায়ত্ত তহবিলের বিনিয়োগে পুঁজিবাজারের আনুমানিক ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের অংশীদারিত্ব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এতে সভরেইন ওয়েলথ ফান্ড ও পেনশন তহবিলগুলো ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, এনভিডিয়া, মেটা ও টেসলায় বড় শেয়ার ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির অবস্থানের প্রতিফলন। এই সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অর্থনৈতিক কাঠামো নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। বিনিয়োগের বেশিরভাগ আসে উপসাগরীয় অঞ্চলের শক্তিশালী ফান্ডের মাধ্যমে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম বিদেশ সফর ছিল সৌদি আরবে। নভেম্বরে হোয়াইট হাউজে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে স্বাগত জানান তিনি। এই সময় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগে সম্মত হয়েছে। পরিকল্পনা আছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে সম্প্রসারণের। আবুধাবি নতুন করে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কাতারও আগামী এক দশকে ৫০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
ব্যয়ের দিক থেকে ২০২৫ সালে শীর্ষে ছিল সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ), যা ৩ হাজার ৬২০ কোটি ডলারের বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর ৮০ শতাংশ খরচ হবে ভিডিও গেম নির্মাতা ইলেকট্রনিক আর্টস অধিগ্রহণে। দ্বিতীয় স্থানে আবুধাবির মুবাদালা, ব্যয় ৩ হাজার ২৭০ কোটি ডলার। শীর্ষ পাঁচ ব্যয়কারী তহবিলে আরও রয়েছে কানাডার সিপিপি, লা কেইস এবং সিঙ্গাপুরের জিআইসি।

