দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এটি কিছুটা কমলেও এখনো ৮-৯ শতাংশের ঘরেই রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়েছে সরকার।
বিদায়ী বছরের তুলনায় চলতি বছরে সঞ্চয়পত্রে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে মাসে মুনাফা কমবে ১১০ টাকা। অর্থাৎ বছরে ঘাটতি হবে ১ হাজার ৩২০ টাকা। যদি কেউ ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তাহলে বছরে মুনাফা কমবে ৬ হাজার ৬০০ টাকা। সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে যাদের পরিবারের খরচের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে চলে, তাঁরা আরও প্রভাবিত হবেন।
অনেকে বলছেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমালে সরকারের ঋণ খরচ সামান্য কমতে পারে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনীতির ধীরগতির সময় এ ধরনের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই এক্সপ্লেইনারে দেখানো হয়েছে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর ফলে সরকারের কী লাভ এবং বিনিয়োগকারীরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
সঞ্চয়পত্রের সুদ কমলো:
সরকার ১ জানুয়ারি নতুন করে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়েছে। সিদ্ধান্তটি আগামী ছয় মাস কার্যকর থাকবে। এতে সর্বোচ্চ মুনাফা দাঁড়াল ১০.৫৯ শতাংশ, সর্বনিম্ন ৮.৭৪ শতাংশ। বিদায়ী বছরের শেষ ছয় মাসে এই হার ছিল যথাক্রমে ১১.৯৮ এবং ৯.৭২ শতাংশ।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে—পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র এবং পরিবার সঞ্চয়পত্র। এর বাইরে চার ধরনের সঞ্চয় বন্ড এবং পোস্ট অফিস সঞ্চয় ব্যাংকে তিন ধরনের পণ্য রয়েছে।
সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার কমে ১১.৯৩ থেকে ১০.৫৪ শতাংশে নেমেছে। ফলে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগে মাসিক মুনাফা ৯৪৪ টাকা থেকে ৮৩৪ টাকায় নেমে যাবে। একই সঙ্গে সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে হার ১১.৮০ থেকে ১০.৪১ শতাংশে কমানো হয়েছে।
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে হার ১১.৯৮ থেকে ১০.৫৯ শতাংশে, বেশি হলে ১১.৮০ থেকে ১০.৪১ শতাংশে নেমেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে কম বিনিয়োগে হার ১১.৮৩ থেকে ১০.৪৪ শতাংশে, বেশি হলে ১১.৮০ থেকে ১০.৪১ শতাংশে নেমেছে। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রেও বিনিয়োগ করলেও মুনাফা কমবে। সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে হার কমে ১১.৮২ থেকে ১০.৪৮ শতাংশে, বেশি হলে ১১.৭৭ থেকে ১০.৪৩ শতাংশে নেমেছে।
সঞ্চয়পত্রের সুদ কমার ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক আয়েও প্রভাব পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, একটি পরিবারের ১০ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থাকলে আগের মাসিক মুনাফা ছিল ৯,০৪১ টাকা। নতুন হার অনুযায়ী তা কমে ৮,২৪১ টাকা হবে। অর্থাৎ মাসে ১,১০০ টাকা, বছরে ১৩,২০০ টাকা কমানো হয়েছে।
সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমার কারণে কেউ চাইলে ব্যাংকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রাখতে পারে। দেশের শীর্ষ ব্যাংকে ৯০ দিনের এফডিআরের সুদহার ৯.২৫ শতাংশ। ১০ লাখ টাকা এফডিআর করলে তিন মাস শেষে মুনাফা হবে ২৩,১২৫ টাকা। কর কেটে হাতে পাবে ২০,৮১২ টাকা, মাসে দাঁড়াবে ৬,৯৩৭ টাকা। সঞ্চয়পত্রের তুলনায় মাসিক মুনাফা ১,৩০৪ টাকা কম হবে।
সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর মূল কারণ হলো বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকে সাধারণ মানুষের আমানত বাড়ানো। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল ৩ লাখ ৩৩,৫৬৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাই-অক্টোবর চার মাসে বেড়েছে ২,৩৭০ কোটি টাকা। এর মানে, সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ঋণ নিচ্ছে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির স্বার্থে ব্যাংকাররা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর দাবি তুলেছে। সরকার সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় এটি কার্যকর করেছে।
পুরনো বিনিয়োগে সুদ কমবে কি?
চলতি বছরের ১ জানুয়ারির আগে ইস্যু হওয়া সব জাতীয় সঞ্চয় স্কিমে প্রযোজ্য হবে সেই সময়ে নির্ধারিত মুনাফার হার। অর্থাৎ আগের বছরের বা তার আগের বছরের সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমবে না। তবে পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন তারিখের হার কার্যকর হবে। ছয় মাস পর মুনাফা বাড়তে বা কমতে পারে।
মধ্যবিত্ত বিনিয়োগকারীর ক্ষতি কত?
সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক মূলত মধ্যবিত্ত পরিবার। বিপদের সময়ে তারা সঞ্চয়পত্র ভেঙে আর্থিক সমস্যা সামলান। অনেক পরিবারের মাসিক খরচের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আসে।
ধরা যাক, একটি পরিবারের ১০ লাখ টাকার বিনিয়োগ পরিবার সঞ্চয়পত্রে আছে। চলতি মাসেই তাদের মেয়াদ পূর্ণ হবে এবং পুনর্বিনিয়োগ করতে হবে। এতদিন তারা প্রতি মাসে ৯,০৪১ টাকা মুনাফা পেত। নতুন সুদহার অনুযায়ী এখন মুনাফা কমে ১,১০০ টাকা। ফলে প্রতি মাসে তারা পাবেন ৮,২৪১ টাকা। সঞ্চয়পত্রের এই পরিবর্তন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়াবে, কারণ অতিরিক্ত খরচ সামলানোর জন্য তারা নতুন বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হবেন।
সঞ্চয়পত্র কম, ব্যাংকেও কি মুনাফা কমবে?
যদি পূর্বের উদাহরণের ১০ লাখ টাকার বিনিয়োগকারী পরিবার সঞ্চয়পত্রে পুনর্বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে স্থায়ী আমানত বা এফডিআর রাখে, তাহলে মুনাফা কত হবে তা দেখা যাক।
বর্তমানে দেশের একটি শীর্ষ ব্যাংকে ৯০ দিনের (তিন মাস) এফডিআরের সুদহার ৯.২৫ শতাংশ। ওই পরিবার যদি ১০ লাখ টাকা এফডিআর করে, তিন মাস শেষে মুনাফা হবে ২৩,১২৫ টাকা। কর কেটে হাতে পাবেন ২০,৮১২ টাকা। অর্থাৎ মাসিক মুনাফা দাঁড়াবে ৬,৯৩৭ টাকা। সঞ্চয়পত্রের তুলনায় এটি ১,৩০৪ টাকা কম। তবে ব্যাংক যদি বেশি সুদ দেয়, মুনাফা কিছুটা বাড়তে পারে।
সরকার কেন বারবার সুদ কমাচ্ছে?
সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণ নেয়। তবে সুদের হার বেশি হলে ব্যয়ও বেড়ে যায়। তাই সরকার সঞ্চয়পত্রের বাইরে কম সুদের ট্রেজারি বন্ড ও বিল থেকে ঋণ নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি প্রাক্কলন ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল ৩ লাখ ৩৩,৫৬৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাই-অক্টোবর চার মাসে বেড়েছে ২,৩৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ঋণ নেয়া হয়েছে।
আরেকটি কারণ—ব্যাংকে সাধারণ মানুষের আমানত বাড়ানো। সঞ্চয়পত্রের সুদ ব্যাংকের আমানতের কাছাকাছি রাখা হলে ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
গত মাসে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধির স্বার্থে ব্যাংকাররা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর দাবি তুলেছেন। সরকার সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

