দেশের রপ্তানি খাতে টানা পাঁচ মাসের নেতিবাচক ধারা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বর মাসে পণ্য রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশ, যা গত দেড় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। এই মাসে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩৯৭ কোটি ডলারের পণ্য, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৬২ কোটি ডলার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত দুটি বড় উৎসের ওপর নির্ভরশীল—রেমিট্যান্স এবং পণ্য রপ্তানি। এর মধ্যে প্রবাসী আয় চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও পণ্য রপ্তানি উল্টো ধারায় হাঁটছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে।
টানা পাঁচ মাস রপ্তানি কমে যাওয়াকে গভীর উদ্বেগের চোখে দেখছেন বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকেরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্ক নীতির কারণে সে দেশের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ফলে প্রত্যাশিত হারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়াদেশ আসছে না। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বেশি হারে পালটা শুল্ক আরোপ করায় ওই দুই দেশের উদ্যোক্তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করছেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এই খাতে সামান্য ধাক্কা লাগলেই তার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে। গত আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা চার মাস তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে, যা চলমান রপ্তানি সংকটকে আরও গভীর করেছে।
অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেক প্রধান উৎস প্রবাসী আয় তুলনামূলকভাবে স্বস্তির জায়গায় রয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ২৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে এসেছে ১ হাজার ৬২৬ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।
গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের পণ্য রপ্তানি ছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেশি। তবে ইপিবি ও এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে পণ্য রপ্তানি নেমে এসেছে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২ হাজার ৪৫২ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসেই রপ্তানি কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ওঠানামার চিত্র স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি হয়েছিল ৪৭৭ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু আগস্টে রপ্তানি ৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩৯২ কোটি ডলারে, যেখানে আগের বছর একই মাসে রপ্তানি ছিল ৪০৩ কোটি ডলার।
এরপর সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আরও কমে ৩৬৩ কোটি ডলারে নেমে আসে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ কম। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে যথাক্রমে ৩৮২ কোটি ও ৩৮৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই দুই মাসে রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ৭ শতাংশ এবং সাড়ে ৫ শতাংশ।
সব মিলিয়ে টানা পাঁচ মাসের এই নেতিবাচক প্রবণতা দেশের রপ্তানি খাত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—বিশ্ববাজারের চাপে বাংলাদেশ কতটা দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

