প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) থেকে পুঁজিবাজারে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহার করতে পারবে ইস্যুয়ার কোম্পানি। তবে এর জন্য দুইটি শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথম শর্ত অনুযায়ী, অর্থ ব্যবহার করতে হবে কোনো প্রকল্প বা বিএমআরই-সংক্রান্ত অনুমোদিত লোনে, এবং আইপিওর অর্থ সেই লোনের পরিমাণ অনুযায়ী ব্যবহার করা যাবে।
দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, অনুমোদিত লোন পরিশোধে খেলাপি বা পুনঃতফসিলীকরণ করা যাবে না। এই বিধানসহ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব সিকিউরিটিজ) বিধিমালা, ২০২৫-এর চূড়ান্ত গেজেট ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে খসড়া প্রস্তাবে আইপিও অর্থে ব্যাংকঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়নি। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছিলেন, ব্যাংকঋণ পরিশোধের সুযোগ না থাকায় কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তিতে আগ্রহী হবে না। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় এই দাবি উঠে। আইপিও বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশ অর্থ ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা যেত। অবশেষে বিএসইসি অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে শর্তসাপেক্ষে ৩০ শতাংশ অর্থ ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহার করার সুযোগ রেখেছে।
নতুন বিধিমালায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও কোটা বাড়ানো হয়েছে। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৬০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ, ইস্যুয়ার কোম্পানির স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশ, উচ্চবিত্ত ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য ৫ শতাংশ এবং অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা নির্ধারিত হয়েছে।
বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ ৩৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ। মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ, কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩ শতাংশ, অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ৭ শতাংশ এবং উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের জন্য ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়ায় ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য ৩৫ শতাংশ এবং বুকবিল্ডিংয়ে ২৫ শতাংশ কোটা সুপারিশ করা হয়েছিল।
আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বরাদ্দে পুরোনো লটারির পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গত কয়েক বছরে প্রো-রাটা পদ্ধতিতে বরাদ্দ দেওয়া হতো, যেখানে আবেদনকারীর পরিমাণ অনুযায়ী শেয়ার দেওয়া হতো। নতুন বিধিমালায় এই পদ্ধতি বাতিল করে লটারির মাধ্যমে বিজয়ীদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হবে। আইপিও আবেদন জমার সময়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। খসড়া বিধিমালায় হিসাব বছরের ৯০ দিনের মধ্যে আবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল, তবে অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে ১২০ দিন বহাল রাখা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবার স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতেই আইপিও অনুমোদন দেবে। এটি আইপিও বিধিমালায় প্রথমবারের মতো সংযুক্ত ধারা। অনুমোদনের আগে ইস্যুয়ার কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জকে কার্যক্রমের ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট জমা দেবে। কোনো ইস্যুয়ারের ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জ আপত্তি জানালে, কোম্পানি বিএসইসিতে আবেদন করে শুনানি পাবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইপিও অনুমোদন বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে নির্দেশক মূল্য (ইনডিকেটিভ প্রাইস) নির্ধারণে ৭৫টি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পরিবর্তে চূড়ান্ত বিধিমালায় ৪০টি রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অবশ্যই স্টক ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি হতে হবে। বাকি ১০টি যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ধরন উন্মুক্ত থাকবে। ইনডিকেটিভ প্রাইস থেকে কাট অফ প্রাইস নির্ধারণ করা হবে এবং এই মূল্যে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুনর্গঠিত বিএসইসি পুঁজিবাজার সংস্কারে ১৭টি কার্যপরিধি নির্ধারণ করে পাঁচ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। এই কমিটি আইপিওসহ বেশ কিছু বিধিমালা নতুন করে প্রণয়ন করে। নতুন বিধিমালার কারণে গত দেড় বছরে কোনো আইপিও আবেদন জমা পড়েনি এবং কোনো নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি।

