পরবর্তী সরকারকে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে বনের হরিণের মতো সতর্ক থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গ্রহণ ও সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি জরুরি।
গতকাল রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)-এর সভাপতি কামরান টি রহমান। সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার। পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম ও গবেষণা পরিচালক বজলুল হক খন্দকারও বক্তব্য দেন। এছাড়া অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরাও উপস্থিত ছিলেন।
পিআরআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘উন্নত মুদ্রাবিনিময় স্থিতিশীলতা, উচ্চ বৈদেশিক রিজার্ভ এবং মন্দাক্রান্ত মুদ্রাস্ফীতির মধ্য দিয়ে মন্থর স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। তবে বিনিয়োগ কমে গেছে, বেকারত্ব বাড়ছে, প্রকৃত মজুরি কমেছে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৪ শতাংশে সীমিত, খাদ্য ও চালের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। ব্যাংকিং খাতের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং ইতিহাসের নিম্ন পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।’ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় আশিকুর রহমান বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি।
প্রধান অতিথি কামরান টি রহমান বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে আর্থিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ধীরগতি ছাড়ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ ও নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত অর্থনীতির সংকট হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন। তিনি ব্যবসায়িক আস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সামগ্রিক অর্থনীতি টেকসই করতে তিনি সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর মধ্যমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান।
ড. জাইদি সাত্তার বলেন, ‘নামমাত্র মুদ্রাবিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল। তবে প্রকৃত কার্যকর বিনিময়হার, যা দেশের প্রতিযোগিতাকে নির্ধারণ করে, গত ৪ মাসে ৬–৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্বল্পমেয়াদে অবমূল্যায়ন রপ্তানি বাড়ায় ও আমদানি কমায়, আর মূল্যায়ন আমদানি বাড়াতে ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি, যা সংকুচিত হয় না, তবে প্রবৃদ্ধি কমে যায়। ১৯৮০-এর দশকে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩–৩.৫ শতাংশ, পরবর্তী দশকে প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে ৪ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি মূলত বিনিয়োগ হ্রাসের কারণে। ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩০ শতাংশ প্রয়োজন, যা বর্তমানে ২৮–২৯ শতাংশ।’
ড. সাত্তার উল্লেখ করেন, ‘ব্যাংকিং খাতে বড় লুটপাটের পরও রক্তক্ষরণ থামানো গেছে। খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিকভাবে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে প্রধান চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি, যা প্রায় ৮.৩ শতাংশ। এটি ধীরে কমছে।’ তিনি বলেন, ‘বৈদেশিক খাতে ২০২২ সালের ধাক্কার পর ভারসাম্য পুনরুদ্ধার হয়েছে। চলতি হিসাব ঘাটতি জিডিপির ১ শতাংশের নিচে, যা টেকসই। তবে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা থাকা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম। এটি স্বীকার করতে হবে।’
প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করেন, ‘ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও জনগণের ওপর সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসইতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ছাড়া প্রবৃদ্ধি ভঙ্গুর হবে।’ তিনি অধ্যাদেশের দুর্বলতা ও রাজস্ব প্রশাসনের ত্রুটিও উল্লেখ করেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকিতে। প্রবৃদ্ধি কমছে, বেকারত্ব বাড়ছে। কঠোর মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণ সংকোচন তীব্র হয়েছে। ব্যর্থ ব্যাংককে সহায়তার বদলে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মূলধন জোরদার করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

