সরকার ২০২৬ সালে পেপার ও প্যাকেজিং পণ্যকে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ খাতের উন্নয়নে নীতিসহায়তা ও প্রণোদনার সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন মেলায় খাতের প্রচার-প্রসার এবং সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হবে।
বর্ষপণ্য ঘোষণার পর খাত সংশ্লিষ্টরা নতুন স্বপ্নে উজ্জীবিত। উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সরকারের নজর এ খাতের জন্য আরও নীতিসহায়তা আনতে সাহায্য করবে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “কী ধরনের নীতিসহায়তা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া যায় তা নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৈঠক হবে। রপ্তানি বাড়াতে রপ্তানি প্রণোদনা, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উৎপাদন সহায়তা এবং প্রচার-প্রসার—all এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। যত বেশি আলোচনা হবে, খাতের জন্য তত সুফল আসবে।”
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ জানান, “নীতিসহায়তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেই। দেশ-বিদেশের আসন্ন মেলায় পেপার ও প্যাকেজিং পণ্য প্রমোট করা হবে। সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে সেমিনার আয়োজন করা হবে। উদ্যোক্তারা যেন দেশের বাইরে তাদের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে, সেজন্য আমরা সহযোগিতা করব। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা বিবেচনা করা হবে।”
গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাজধানীর পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার (বিগ ওয়েভ)-এ ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন পেপার ও প্যাকেজিং পণ্যকে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, “প্রতি বছর একটি পণ্যকে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘোষিত পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন উৎসাহিত করা হয়। এবার পেপার ও প্যাকেজিং প্রোডাক্টকে ২০২৬ সালের প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করছি।”
ক্রেতা-ভোক্তাদের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্যাকেজিং শিল্পের প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএফপিআইএ)। সংগঠনের সদস্য শতাধিক প্রতিষ্ঠান। তারা জানাচ্ছে, খাতের বাজার ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি এবং এখানে প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থান রয়েছে।
বিএফপিআইএর সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর বলেন, “তিন-চার মাস ধরে আমরা পেপার ও প্যাকেজিং শিল্পকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করার চেষ্টা করছিলাম। এখন সরকার এটি ঘোষণা করেছে। খাতটির অনেক সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। এটি একটি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প হওয়ায় আগে নজরে কম পড়ত। আশা করি এ বছর নীতিসহায়তা পেলে খাতটি আরও এগোবে।”
তিনি আরও জানান, “বিশ্বে প্যাকেজিং খাত অনেক বড়। আমাদের রপ্তানি এখন সীমিত। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিসহায়তা প্রয়োজন। পণ্য দেশের বাইরে প্রসারিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা পরোক্ষভাবে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। যে কোনো পণ্য রপ্তানিতে প্যাকেজিং প্রয়োজন, এটি খাতের বড় সম্ভাবনা দেখায়।”
গার্মেন্টস খাতের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ) সরকারী ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটি এটিকে পেপার ও প্যাকেজিং শিল্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি। এটি উদীয়মান খাত। বিশ্ববাজারে প্যাকেজিংয়ের চাহিদা অনেক, তবে নীতিসহায়তার অভাবে আমরা সেখানে প্রবেশ করতে পারছি না। বর্ষপণ্য ঘোষণার মাধ্যমে খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে রপ্তানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশে বছরে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজিং পণ্য রপ্তানি হয়, ডিরেক্ট রপ্তানি এক দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার। ব্যাক টু ব্যাক এই উদ্যোগ খাতের জন্য ইতিবাচক। প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে এনবিআরের নীতিসহায়তা, উচ্চ ব্যাংকিং সুদ এবং প্যাকেজিংয়ে বিশেষজ্ঞ অভাব। প্যাকেজিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে। সঠিক নীতিসহায়তা পেলে এক-দুই বছরের মধ্যে ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি রপ্তানি সম্ভব।”
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা জানান, বর্ষপণ্য ঘোষণার পরও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়নি। তবে সরকার জানিয়েছে, পরবর্তী বৈঠকে খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

