নির্বাচন কমিশন (ইসি) আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করেছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ নির্বাচনি বাজেট এবং আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচন খরচের বড় অংশ প্রায় অর্ধেকই নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। ইসি সচিবালয় সূত্র এবং পূর্ববর্তী সংসদ নির্বাচনের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে নির্বাচনি খরচ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, একসঙ্গে দুই ভোট আয়োজন, বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জটিলতা—এসব মিলিয়ে নির্বাচনের ব্যয় তীব্রভাবে বাড়ছে।
দুই ভোটের প্রেক্ষাপট: ব্যয় বেড়েছে নতুন দায়িত্বে:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এবার একই দিনে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। একসঙ্গে দুই ধরনের ভোট আয়োজনের কারণে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নতুন খাতের ব্যয় যুক্ত হয়েছে। ইসি সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে সংসদ নির্বাচনের জন্য বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পরে গণভোট যুক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকায়।
দুই ভোটের কারণে বাড়ছে ব্যালট পেপার, গোপন বুথ, জনবল, পরিবহন ও নিরাপত্তা খরচ। প্রতিটি কেন্দ্রে আগের তুলনায় একটি অতিরিক্ত গোপন বুথ স্থাপন করা হবে। আগেরবার প্রতিটি গোপন বুথের খরচ ছিল ৮০০ টাকা। এবার প্রতিটি কেন্দ্রে দুটি গোপন বুথের জন্য বাজেট ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা।
এছাড়া কেন্দ্রপ্রতি নির্ধারিত ব্যালট বাক্সের বাইরে আরও ১০০টি বাড়তি বাক্স দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো এবং পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাপনার মতো নতুন কার্যক্রম যুক্ত হওয়ায় নির্বাচনের পরিচালনা খাতেও ব্যয় বেড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা খাতেও বাজেট রেকর্ড:
নির্বাচনের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। ইসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পুলিশ, আনসার, বর্ডার গার্ড, কোস্টগার্ড, র্যাব এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর মোতায়েন, প্রশিক্ষণ, ভাতা, যানবাহন ও সরঞ্জাম—সব মিলিয়ে এই খাতে ব্যয় বিগত সব নির্বাচনের তুলনায় সবচেয়ে বেশি।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, “এবার একসঙ্গে দুই ভোট আয়োজন এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়েছি। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে। সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা না দিলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা খাতে বাজেট বড় করা হয়েছে।
নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয়বহুল খাতগুলো:
আইনশৃঙ্খলা খাতের বাইরে বাকি বাজেট যাচ্ছে নির্বাচন পরিচালনার খাতে। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাপনা, প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের সম্মানী, ব্যালট পেপার ও অন্যান্য নির্বাচনিসামগ্রী, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক খরচ।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এবার আলাদা করে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাপনায় বাজেট ধরা হয়েছে। প্রতিটি ভোটারের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০০ টাকা, যা আগের নির্বাচনে ছিল না।
বিগত সংসদ নির্বাচনে ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান ধারা: বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যয়ের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায় ক্রমবর্ধমান ধারা।
- ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
- দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় বেড়ে হয় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
- তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫ কোটি ১৬ লাখ এবং চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়।
- পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় বেড়ে হয় ২৪ কোটি ৩৭ লাখ, ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে ৩৭ কোটি।
- সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ১১ কোটি ৪৭ লাখ, অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৭২ কোটি ৭১ লাখ এবং নবম সংসদ নির্বাচনে ১৬৫ কোটি টাকা।
- ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছে ২৬৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যার মধ্যে আইনশৃঙ্খলায় খরচ হয়েছিল ১৮৩ কোটি টাকা।
- ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
- সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা, যার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা খাতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
এভাবে গত এক দশকে নির্বাচনি ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। প্রতিবারই আইনশৃঙ্খলা খাত সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা ব্যয়ের বৃদ্ধির কারণ:
এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা ব্যয় বাড়ার কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে। ভোটার সংখ্যা ও কেন্দ্র বৃদ্ধি, নির্বাচনি সহিংসতার আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে বাহিনী মোতায়েন, বাহিনীর সদস্যদের সম্মানী ও ভাতা বৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবহন খরচের বৃদ্ধি এবং দ্রব্যমূল্যের সার্বিক ঊর্ধ্বগতি—এসব কারণে আগের মতো সীমিত বাজেটে নির্বাচন পরিচালনা আর সম্ভব নয়।
নির্বাচনি বাজেট সম্পর্কে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। তিনি বলেন, “এই অর্থ নির্বাচন পরিচালনায় যথাযথভাবে ব্যয় করা হবে। প্রয়োজনে সরকার অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার জন্যও প্রস্তুত। বরাদ্দ অর্থ একটি প্রাক্কলন মাত্র। প্রকৃত কাজের ভিত্তিতে ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।”

