বাংলাদেশের কার্বন মার্কেটে দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে বনায়ন, কৃষি ও জ্বালানি খাতগুলোতে। এসব কোম্পানি সম্ভাব্য প্রকল্পগুলো যাচাইয়ের কাজও শুরু করেছে।
সরকার জানাচ্ছে, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে কার্বন নির্গমন কমানোর জাতীয় অঙ্গীকার পূরণ হবে। একই সঙ্গে বন, কৃষি ও জ্বালানি খাত পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে উঠবে। বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান এটিইসি, দক্ষিণ কোরিয়ার ইডব্লিউসি, জাপানের মিটসুই ও সুমিটোমা। এছাড়া যাচাই প্রক্রিয়ায় আছে দুটি বৈশ্বিক এনজিও—ইকো–সোশ্যাল সলিউশনস এবং ভ্যালু নেচার ভেনচারস।
দেশের তিনটি এনজিও—আরণ্যক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মাটি অর্গানিক লিমিটেড ও বাংলাদেশ বন্ধু ফাউন্ডেশন—ও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংও এখানে যুক্ত আছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ৭৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে।
বনায়নের জন্য বন বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক প্রস্তাব দিয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো ইকো–সোশ্যাল সলিউশনস, ভ্যালু নেচার ভ্যানচার, বাংলাদেশ বন্ধু ফাউন্ডেশন, আরণ্যক ফাউন্ডেশন, মাটি অর্গানিক লিমিটেড এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং।
জাপানি প্রতিষ্ঠান মিটসুই কৃষি খাতে অতিরিক্ত পানির ব্যবহার কমাতে ২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে ‘অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে চায়। এই পদ্ধতিতে কম পানি ব্যবহার করে উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব এবং মিথেন গ্যাসের নির্গমন কমানো যায়। অন্যদিকে সুমিটোমো গ্যাস লাইনের লিকেজ বন্ধ করে মিথেন কমাতে চায়।
অস্ট্রেলিয়ার এটিইসি ও কোরিয়ার ইডব্লিউসি রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের বদলে ক্লিন কুকিং স্টোভ ব্যবহার বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। বন অধিদপ্তর জানাচ্ছে, উপকূলীয় বনায়নের কারণে ৫ বছরের মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর নতুন ভূমি তৈরি হবে। এই নতুন ভূমিতে আগ্রহী কোম্পানিগুলো বনায়নের মাধ্যমে কার্বন ট্রেডিংয়ে অংশ নিতে পারবে।
বন বিভাগের উপপ্রধান বন সংরক্ষক (পরিকল্পনা) রকিবুল হাসান বলেন, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্বন ট্রেডিংয়ে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। বিনিয়োগ হবে দুটি মডেলে—একটি সরাসরি বিনিয়োগ, অন্যটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্বে (পিপিপি)।
তিনি আরও বলেন, কতটুকু জমিতে বনায়ন করা যাবে এবং কত কার্বন শোষিত হবে, তা বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর নির্ধারণ করবে। এরপর তৈরি হবে ‘প্রজেক্ট ডিজাইন ডকুমেন্ট’। বিনিয়োগের পর কার্বন শোষণের কত শতাংশ কার্বন মার্কেটে যাবে এবং কত অংশ সরকার পাবে, তা দর-কষাকষির মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, গণশুনানি হয়েছে কি না, সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ হয়েছে কি না, তা ডিএনএর অধীনস্থ টেকনিক্যাল কমিটি পর্যালোচনা করবে। কার্বন ট্রেডিং সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ ও প্রকল্প অনুমোদনের দায়িত্বে সরকার গত বছরের জুনে গঠন করেছে ‘ডেজিগনেটেড ন্যাশনাল অথরিটি’ (ডিএনএ)। এটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে। ডিএনএর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব।
বন বিভাগের উপপ্রধান বন সংরক্ষক (পরিকল্পনা) রকিবুল হাসান আরো বলেন, “আমরা জমিটা ব্যবহার করতে দেব। তারা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এরপর কার্বন যেটা শোষিত হবে, তার কত শতাংশ কার্বন মার্কেটে যাবে এবং কত শতাংশ আমরা পাব, তা দর–কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।”
কার্বন ট্রেডিং কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ:
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার প্রধান কারণ কার্বন নির্গমন। শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায় সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কার্বন নির্গমনকারী দেশ হলো চীন। এটি বিশ্ব কার্বন নির্গমনের ৩৫ শতাংশ ঘটায়। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শীর্ষ নির্গমনকারী অন্যান্য দেশ হলো ভারত, রাশিয়া, জাপান, কানাডা ও সৌদি আরব। বাংলাদেশের অবদান মাত্র ০.৪৮ শতাংশ।
কার্বন ট্রেডিং হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর একটি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা। এতে সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্ধারণ করে দেয় কোনো দেশ, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি সর্বোচ্চ কতটুকু কার্বন নির্গমন করতে পারবে। নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কার্বন নির্গমন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বাজার থেকে কার্বন ক্রেডিট কিনতে হয়।
কার্বন ক্রেডিট তৈরি করা যায় বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে। যেমন—বনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বা পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ করা। পরে এই ক্রেডিটগুলো দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বা দেশগুলোর কাছে বিক্রি করা হয়।
২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলো প্যারিস চুক্তিতে সম্মত হয়। চুক্তির লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা। এই চুক্তিতে দেশগুলো নিজ নিজ কার্বন নির্গমন কমানোর রূপরেখা নির্ধারণ করে, যা এনডিসি (ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন) নামে পরিচিত। কার্বন ট্রেডিং এমন একটি প্রক্রিয়া যা গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো ও বাজারভিত্তিক প্রণোদনার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করে।
সবশেষ ২০২৫ সালে জমা দেওয়া এনডিসিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কার্বন নির্গমন প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৪১৮.৪০ মিলিয়ন টন। এ এনডিসিতে ২৬.৭৪ মেট্রিক টন কার্বন নির্গমন কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। বৈশ্বিক সহযোগিতা পাওয়া গেলে আরও ৫৮.২৩ মিলিয়ন টন কার্বন কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
বর্তমানে দুটি কার্বন মার্কেট কার্যকর রয়েছে। একটিকে বলা হয় কমপ্লায়েন্স কার্বন মার্কেট। এখানে কোনো দেশ যদি নির্ধারিত কার্বন নির্গমন সীমা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে অন্য দেশের কাছ থেকে কার্বন ক্রেডিট কিনে তা পূরণ করতে হয়। দ্বিতীয়টি হলো ভলান্টারি কার্বন মার্কেট। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব হিসেবে ভাবমূর্তি তৈরি করতে নিজেদের দূষণের সমপরিমাণ কার্বন ক্রেডিট কিনে নেয়।
বিশ্বব্যাংক দিয়েছে ২৪ কোটি টাকা:
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য ২৪ কোটি টাকা দিয়েছে কার্বন ট্রেডিং–সংক্রান্ত রূপরেখা তৈরি এবং একটি জাতীয় কার্বন নিবন্ধন পদ্ধতি (ন্যাশনাল কার্বন রেজিস্ট্রি সিস্টেম) গঠনের জন্য। এই অর্থ দেওয়া হয়েছে পার্টনারশিপ ফর মার্কেট ইনিশিয়েটিভের (পিএমআই) আওতায়।
ভলান্টারি কার্বন মার্কেটে বিনিয়োগকারী আনার জন্য সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ইতিমধ্যে সই করেছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। এডিবি ও বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করবে। এরপর প্রকল্প তৈরি করা হবে এবং সরকারের অনুমোদন পেলেই বাস্তবায়ন শুরু হবে।
দেশে প্রথমবারের মতো কার্বন ট্রেডিং করেছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। ২০০৬ সালে তারা সোলার হোম সিস্টেম ও উন্নত চুলা থেকে কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে ১৭০ কোটি টাকা আয় করেছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আর কোনো কার্বন ট্রেডিং হয়নি। যেই ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় এটি হতো (কিয়োটো প্রটোকল), তার মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালে। ২০২৪ সালে প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল-৬ গৃহীত হওয়ায় আবার কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউএনডিপি জানাচ্ছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে কার্বন ট্রেডিং হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের ২৮ শতাংশই কার্বন ট্রেডিংয়ের আওতায় এসেছে।
ডিএনএর সদস্য ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন শাখার পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, “এ মাসের মধ্যেই আমরা কার্বন ট্রেডিং ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করতে পারব। ২০২৫ সালে জমা দেওয়া এনডিসিতে কার্বন ট্রেডিংকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছি। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এনডিসির লক্ষ্যমাত্রার ৪০–৫০ শতাংশ কার্বন ট্রেডিং থেকে পূরণ হবে।”

