সুস্বাস্থ্য এবং নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তার কারণে হালাল পণ্যের চাহিদা বিশ্বব্যাপী বেড়েই চলেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভোক্তারা হালাল পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে হালাল পণ্যের বিশ্ববাজারের আকার প্রায় ৩.৩০ ট্রিলিয়ন ডলার, এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী এক দশকে এটি প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশ এই বিশাল বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দেশের হালাল পণ্য রপ্তানি মাত্র ৮৫ কোটি ডলার, যা সামর্থ্যের তুলনায় খুবই নগণ্য।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, হালাল খাতে বাংলাদেশের বড় প্রতিবন্ধকতা হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সার্টিফিকেশন না থাকা। এছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতি, ব্র্যান্ডিং এবং সমন্বিত নীতিমালার অভাব, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সাপ্লাই চেইনের সমস্যা রপ্তানি অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
হালাল পণ্যের মধ্যে মূলত কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য আসে। তবে পোশাক, কসমেটিকসহ বিভিন্ন পণ্যও এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য যেমন মাংস, মাছ, ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে রপ্তানি হয়—বিশেষ করে সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান ও তুরস্কে।
বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের চাহিদা প্রায় ১৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বাজার ৯.৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশ মাত্র 0.0৩ শতাংশ।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত জাতীয় হালাল নীতি বা কেন্দ্রীয় হালাল বোর্ড নেই। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই পৃথকভাবে হালাল সনদ দিচ্ছে—ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৬০টি, আর বিএসটিআই ৩০টি কোম্পানিকে।
দুই সংস্থার ভিন্ন ধরনের সনদের কারণে ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় বাজারে প্রবেশ করতে হলে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা প্রয়োজন, যা এখনও বাংলাদেশি সনদদাতাদের অর্জন হয়নি। এর ফলে প্রায় সময় রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যায়।
বিএসটিআইর হালাল সনদ বিভাগের সহকারী পরিচালক জিশান আহমেদ তালুকদার বলেন, হালাল পণ্য এখন শুধু ধর্মীয় বিষয়ে আবদ্ধ নয়; অমুসলিমরাও স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কারণে এগুলো বেছে নিচ্ছেন। তাই আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতির জন্য বিএসটিআইর সনদের গ্রহণযোগ্যতা অপরিহার্য।
আইইউবিএটির সহকারী অধ্যাপক মমিনুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে হালাল সনদ সাধারণত একটি সংস্থা দেয়। বাংলাদেশে দুটি সংস্থা থেকে সনদ পাওয়ার ফলে জটিলতা তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের পণ্যের মান উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, হালাল সনদে মূল কাজ করে বিএসটিআই। আন্তর্জাতিকভাবে এটি আরও গ্রহণযোগ্য করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। ভবিষ্যতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন হয়তো হালাল সনদের দায়িত্ব নাও রাখতে পারে।
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে হালাল পণ্যের একটি শীর্ষ হাবে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে। তবে বিশ্ববাজারে দেশের ব্র্যান্ড পরিচিতি এখনও দুর্বল। বাংলাদেশ কাঁচামাল বা কমমূল্যের সরবরাহকারীর পরিচয় থেকে বের হতে পারেনি।
আধুনিক পরীক্ষাগার, কোল্ড চেইন, ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা এবং বিশেষায়িত হালাল শিল্পপার্কের অভাবে রপ্তানির সক্ষমতা সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
বেঙ্গল মিটের সিইও আহমদ আসিফ বলেন, ক্রেতারা শুধু ‘হালাল’ সিল দেখলেই সন্তুষ্ট নয়। তারা চাইছেন পশুর জন্ম, খাদ্য, ভ্যাকসিনেশন এবং জবাইয়ের প্রতিটি ধাপের ডিজিটাল রেকর্ড দেখতে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি নেওয়া সংস্থা যেমন ফ্রান্সভিত্তিক ডব্লিউওএএইচ-এর সনদ গ্রহণও জরুরি।
প্রাণ গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব না থাকায় পণ্যের মান সনদ পাওয়া কঠিন। এতে রপ্তানি বাজারে গ্রহণযোগ্যতা কমে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

