বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সরকার কক্সবাজারে টেকনাফের সাবরাং, মহেশখালীর নাফ ট্যুরিজম পার্ক ও সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রায় ১১ হাজার একর জমিতে এগুলো শুরু হলেও ৯ বছর পার হতে চললেও আলোর মুখ দেখেনি।
প্রকল্পগুলো এখন আর অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “সাবরাং পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময় হলেও আমরা বর্তমানে পাঁচটি অগ্রাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজে মনোযোগ দিচ্ছি, যার মধ্যে সাবরাং নেই।” সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্প পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অজুহাতে বাতিল করা হয়েছে। ফলে দেশীয় পর্যটক ও বিদেশি পর্যটক উভয়ের জন্য সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত থমকে গেছে।
পর্যটকরা অভিযোগ করেছেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সূর্যাস্ত দেখা ছাড়া সময় কাটানোর কিছু নেই। পর্যটন স্পট, বিনোদন বা সেবা উন্নত হয়নি। সৈকতের সৌন্দর্য দিন দিন ক্ষয় হচ্ছে। নারীরা হেনস্তা ও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। গোসলে নেমে দুর্ঘটনা ঘটছে, কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা সীমিত। দ্রুত গতির জেটস্কি ও প্যারা সেইলিংয়ের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। মৌসুম অনুযায়ী হোটেল, গাড়ি ভাড়া ও খাবারের দাম বাড়ানো হচ্ছে, অথচ প্রশাসনের নজর নেই। তুলনামূলকভাবে ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বিদেশি পর্যটক কম খরচে নিরাপদভাবে ভ্রমণ করতে পারেন।
কক্সবাজার পর্যটনশিল্প ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তা ও এক্সক্লুসিভ জোনের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। রাতের বিনোদন নেই, সৈকত অপরিচ্ছন্ন, ‘সান বাথার’ মতো মৌলিক সুবিধা নেই। আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, খাদ্য, যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা, ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন গাইড, নিরাপত্তা, বিনোদন, শপিং, পার্ক, লকার, প্রদর্শনী বা আন্তর্জাতিক মানের মঞ্চের অভাব রয়েছে। সিনেপ্লেক্স, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, থিম পার্ক, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো, সমুদ্র ক্রুজ ও এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোনও নেই। এসব কারণে বিদেশি পর্যটক আশা করা কঠিন।
কক্সবাজার সিটি কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মইনুল হাসান পলাশ বলেন, “কক্সবাজারের পর্যটন শুরু থেকেই পরিকল্পনাহীন ও অগোছালো। মানসম্মত দেশীয় পর্যটন গড়ে উঠলে তার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক পর্যটন দাঁড়ায়। এখানে তা হয়নি। বিদেশিরা কংক্রিট বা ঢেউ দেখার জন্য আসে না, তারা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসে। কক্সবাজারে সেই সুযোগ নেই।”
হোটেল সি-প্রিন্সেসের ম্যানেজার মাজেদুল বশার চৌধুরী সুজন বলেন, “পর্যটন মৌসুমে ২০–২৫ লাখ দেশীয় পর্যটক আসেন। বিদেশি পর্যটক প্রায় শূন্য।” ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা ব্যবসায়ী মোকাম্মেল হোসেন বলেন, “কক্সবাজার আগের মতোই। সমুদ্রের বালিয়াড়ি দখল করে দোকানপাট, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, ভিক্ষুক ও ছিনতাইকারীর ভিড় বেড়েছে। আধুনিক চেঞ্জিং রুম নেই। অস্বাস্থ্যকর ঘরে পর্যটকদের গোসল করানো হচ্ছে।” পর্যটক জামশেদ হোসাইন জানান, “রাতের লাইটিং নেই। হোটেল-মোটেল জোন নিরাপদ নয়। আবাসন, যাতায়াত ও খাবারে খরচ দেখে বিদেশ ভ্রমণ করা সহজ।”
তারকা মানের হোটেল সায়মান বিচ রিসোর্টের সিনিয়র অফিসার আসাদুজ্জামান নুর বলেন, “হোটেলে লাইসেন্সকৃত বার, সুইমিংপুল, সি-বিচ বসার ব্যবস্থা, রেস্টুরেন্ট, জিমনেসিয়াম ও কনফারেন্স হলসহ আন্তর্জাতিক মানের সব সুযোগ রয়েছে।”
ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত। চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার ও হোটেল অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ২১৯ জন হারানো শিশু উদ্ধার করে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি, টহল, লাইটিং ও অভিযোগ বক্স স্থাপন করা হয়েছে।
কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, “পর্যটকের সুবিধা ও নিরাপত্তায় প্রশাসন সচেষ্ট। অভিযোগ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।” বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান সায়েমা শাহীন সুলতানাকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

