ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করতে যাচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষর হবে জাপানের রাজধানী টোকিওতে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকার বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) ছাড়া বাংলাদেশের কোনো দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যচুক্তি নেই। জাপানের সঙ্গে ইপিএ সইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়া শুরু করছে। সরকার মনে করছে, চুক্তি শুধু বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি করবে। এ মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমবে এবং জাপান বাংলাদেশের বড় বাজার হয়ে উঠবে। তবে বিশেষজ্ঞরা কিছু ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ-জাপান ইপিএর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে। তখন যৌথ গবেষণা দল গঠন করা হয় দর-কষাকষির ভিত্তি তৈরির জন্য। ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর দলটি ১৭টি খাত নিয়ে সমন্বিতভাবে দর-কষাকষির পরামর্শ দেয়। এ প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তী আলোচনা এগোয়। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইপিএ নিয়ে দর-কষাকষি ঘোষণা দেয়। মে মাসে ঢাকায় প্রথম রাউন্ডের আলোচনা শুরু হয়। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে আলোচনা থমকে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনায় বসে এবং এক বছরের মধ্যে চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
ঢাকা-টোকিও-ঢাকা ফরম্যাটে মোট সাত দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বর ঢাকায় দ্বিতীয়, ডিসেম্বরে টোকিওতে তৃতীয় রাউন্ড হয়। ২০২৫ সালে ঢাকায় চতুর্থ, টোকিওতে পঞ্চম, ঢাকায় ষষ্ঠ এবং সেপ্টেম্বরে টোকিওতে সপ্তম ও চূড়ান্ত রাউন্ডে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২২ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ইপিএ সইয়ের কথা জানায়।
এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে জাপানের সঙ্গে ইপিএ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি শুধু বাজার সুবিধা নয়, সেবা খাতের সুযোগও বাড়াবে। রাজস্ব প্রভাব সম্পূর্ণ জানা না গেলেও চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কিছু অতিরিক্ত সুবিধা পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “জাপানের সঙ্গে ইপিএ সই হবে ৬ ফেব্রুয়ারি। এ জন্য আমি ও বাণিজ্য উপদেষ্টা টোকিও যাচ্ছি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জাপানে বাংলাদেশিদের জন্য সেবা খাত উন্মুক্ত হচ্ছে।”
ইপিএ মূলত দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণ্য পরিসর তৈরি করবে। এতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, আমদানি কোটা সংশোধন, পণ্য ও সেবাবাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। উত্তরণের পর উন্নত দেশের বাজারে শুল্কসুবিধা কমার আশঙ্কা থাকায় জাপানের সঙ্গে ইপিএ দীর্ঘমেয়াদে বাজার সুবিধা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুল্কমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার নিয়ে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ:
চুক্তি সই হওয়ার দিন থেকেই বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে একই সুবিধা পাবে। ইপিএর মাধ্যমে বাংলাদেশের ৯৭টি উপখাত জাপানের জন্য উন্মুক্ত হবে। জাপানের ১২০টি উপখাত বাংলাদেশে খোলা হবে। পণ্যের পাশাপাশি এতে সেবা, বিনিয়োগ এবং সহযোগিতার সুযোগও অন্তর্ভুক্ত।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এটি বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। জাপান বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-কে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এলডিসি ও এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলোকে জিএসপি সুবিধা দেওয়ার নোটিফিকেশন দিয়েছে। ইপিএকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছে। জিএসপি সাময়িক হলেও ইপিএ একটি বাধ্যতামূলক চুক্তি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশকে সব সময় ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু ভিয়েতনামের ৩০টি দেশের সঙ্গে চুক্তি আছে। বাংলাদেশ এখন মাত্র শুরু করছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চুক্তি করা সম্ভব। এতে এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ হবে।
জাপান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) মহাসচিব মারিয়া হাওলাদার বলেন, “চুক্তির খসড়া পুরোপুরি জানি না। তবে বুঝতে পারি, এতে বাংলাদেশ লাভবান হবে। বাংলাদেশের শুল্ক প্রক্রিয়া নিয়ে জাপানের আগের মাথাব্যথা এবার থাকবে না বলে ধরে নেওয়া যায়।”
সম্ভাব্য লাভ ও ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ:
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, আগে জাপানের কাছে বেশি বিনিয়োগ চাইলেও কাঠামোগত চুক্তি না থাকায় তা বাধাগ্রস্ত হতো। ইপিএ এই বাধা দূর করবে। ফলে অবকাঠামো, উৎপাদন, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে। জাপানের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের শিল্প যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ইপিএ কার্যকর হলে প্রথমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়বে। তৈরি পোশাক, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য জাপানের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক পরিসরে খুব কম।
জাপান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) মহাসচিব মারিয়া হাওলাদার বলেন, “চুক্তির খসড়া পুরোপুরি জানি না। তবে বুঝতে পারি, এতে বাংলাদেশ লাভবান হবে। বাংলাদেশের শুল্কপ্রক্রিয়া নিয়ে জাপানের আগের মাথাব্যথা এবার থাকবে না বলে ধরে নেওয়া যায়।”
ইপিএ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও তৈরি করবে। জাপানের উচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করতে গিয়ে দেশীয় শিল্পের মানও উন্নত হবে। ২০২৬ সালের পর এলডিসি সুবিধা কমতে পারে। জাপানের সঙ্গে ইপিএ এই প্রভাব সামলাতে সহায়ক হতে পারে। তবে চুক্তি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। শুল্ক কমলে জাপানের উন্নত প্রযুক্তির পণ্য সহজে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। এতে কিছু দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতার চাপ অনুভব করতে পারেন। আমদানি শুল্ক কমার কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া জাপানের বাজারে প্রবেশের জন্য কঠোর মান, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রস্তুতি না থাকলে প্রত্যাশিত রপ্তানি সুবিধা পুরোপুরি মিলতে নাও পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইপিএ থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে খাতভিত্তিক প্রস্তুতি, শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব কাঠামোয় সংস্কার জরুরি। সঠিক প্রস্তুতি থাকলে জাপানের সঙ্গে প্রথম ইপিএ বাংলাদেশের জন্য এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বড় সহায়ক হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এলডিসি উত্তরণ টেকসই করতে জাপানের সঙ্গে ইপিএ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে শুধু বাজার সুবিধা নয়, সেবা খাতের সুযোগও উন্মুক্ত হবে। রাজস্ব প্রভাব সম্পূর্ণ জানা নেই, তবে ইপিএ থেকে বাংলাদেশ কিছু বাড়তি সুবিধা পাবে। জাপান বিনিয়োগ চীন থেকে সরিয়ে আনছে, এটি কাজে লাগানো যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “জাপানের সঙ্গে ইপিএর মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি দর-কষাকষির পুল তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এটি অন্য দেশ বা অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে দর-কষাকষিতে কাজে লাগবে।”

