চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার বকেয়া শুল্ক ও করের পরিমাণ ৩৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি দাঁড়িয়েছে। কাস্টমস জানায়, এই বকেয়া সরকারকে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস পেট্রোবাংলার কাছে ২২ হাজার ৪৮.৬২ কোটি টাকা বকেয়া শুল্ক ও কর দাবি করেছে। চিঠিতে উল্লেখ আছে, আইনসম্মত মূল্যায়ন ও অর্থ পরিশোধ ছাড়াই এলএনজি কার্গো ছাড় করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ৪০৮টি বিল অব এন্ট্রির আওতায় এলএনজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৮টি বিলের বিপরীতে ১ হাজার ৬১০.৫৪ কোটি টাকা শুল্ক পরিশোধ হয়েছে। বাকি ৩৭০টি চালান কোনো ধরনের অর্থ পরিশোধ ছাড়াই ছাড় করা হয়।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি আমদানিকারকরা পণ্য বন্দর থেকে ছাড় পেতে শুল্ক ও কর আগে পরিশোধ করে। কিন্তু বিপিসি ও পেট্রোবাংলা তা না করেই চালান ছাড় করছে। এর ফলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানির সঙ্গে যুক্ত। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৮৩, ৮৪ ও ৯০ ধারার বিরুদ্ধে এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে। এই ধারাগুলোর মতে, পণ্য ছাড়ের আগে বিল অব এন্ট্রি দাখিল, মূল্যায়ন সম্পন্ন এবং প্রযোজ্য শুল্ক ও কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার তফছির উদ্দিন ভূঁঞা বলেন, “পেট্রোবাংলা শুল্ক বা কর পরিশোধ না করেই বিল অব এন্ট্রি দাখিলের মাধ্যমে এলএনজি চালান ছাড় করছে, যা স্পষ্টতই আইনের পরিপন্থী।”
বিপিসির কাস্টমস দায় ১২ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা:
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো—পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল কোম্পানি, ইস্টার্ন রিফাইনারি ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক—কাস্টমসের কাছে বিপুল দায় জমিয়েছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান ৭ হাজার ১৯০টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করেছে। এতে সম্ভাব্য বকেয়া শুল্ক ও করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৯৫টি বিলের জন্য শোকজ ও ডিমান্ড নোটিশ জারি করা হয়েছে। এ থেকে ৩ হাজার ৪৩০.৩২ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছে। পরে বিপিসি ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করলেও, ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৭৮টি বিলের জন্য ২ হাজার ৭৩০.৩২ কোটি টাকার চূড়ান্ত ডিমান্ড নোটিশ এখনো মেটানো হয়নি।
কাস্টমস দায় পরিশোধে অসম ব্যবস্থা:
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সরকারি আমদানিকারকরা সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করায় চূড়ান্ত ডিমান্ড নোটিশ দিতে হয়েছে। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো এমন সুবিধা ভোগ করছে যা বেসরকারি আমদানিকারকদের নেই। এর ফলে তারা তাৎক্ষণিক শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই পণ্য ছাড় করাতে পারছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার তফছির উদ্দিন ভূঁঞা বলেন, “বেসরকারি আমদানিকারকরা শুল্ক না দিলে পণ্য ছাড় পায় না। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো পারে। এই বৈষম্যের কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।” তিনি আরও জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি হয়। তাই বিপিসি ও পেট্রোবাংলার বিলম্ব সরাসরি জাতীয় রাজস্ব পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “দুই সংস্থা ভোক্তাদের কাছ থেকে শুল্ক ও কর আদায় করলেও তা সময়মতো সরকারের কাছে জমা দিচ্ছে না। শুল্ক না দিয়ে আমদানি ছাড় করানো স্পষ্ট অনিয়ম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচিত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা।”
শুল্ক পরিশোধে বিলম্বের কারণ:
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানান, আগে এলএনজি আমদানিতে দ্বৈত কর ব্যবস্থা ছিল। আমদানির সময় ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বিতরণের সময়ে আরও ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো। তিনি বলেন, “২০২৫ সালের জুনে সরকার আমদানি পর্যায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে। এখন কেবল ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) রয়েছে, এলএনজিতে কোনো কাস্টমস শুল্ক নেই। আমরা নিয়মিত এআইটি পরিশোধ করছি। ২২ হাজার ৪৮ কোটি টাকার অধিকাংশ বকেয়া জুন ২০২৫-এর আগের সময়ের।”
পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকারের ভর্তুকি পরিশোধে দীর্ঘস্থায়ী বিলম্বই মূলত কর পরিশোধে সংস্থাটির অক্ষমতার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, “আমরা গ্যাস বিক্রি করি প্রায় ২ টাকা প্রতি ইউনিট ভর্তুকি রেটে। সরকার এই ভর্তুকি পরিশোধ করবে বলেও স্থির করা থাকলেও অর্থ বিভাগের বিলম্বে নগদ সংকট তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও জানান, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক এলএনজি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজনুর রহমান বলেন, “আমরা এনবিআর ও অর্থ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। কিছু বকেয়া ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। ভর্তুকির অর্থ ছাড় হলে বাকি দায়ও নিষ্পত্তি করা হবে।”
বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মন্তব্য করেননি। তবে বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, করপোরেশনের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত কর ও শুল্ক পরিশোধ করে থাকে। কেবল কাস্টমস দাবি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলেই অর্থ আটকে রাখা হয়।
বাজেটে শুল্ক প্রত্যাহার ও হ্রাস:
২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসসহ কয়েকটি জ্বালানির আমদানির শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। সিএনজি, এনপিজি ও এলএনজিতে শুল্ক ছাড়ও দেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে শূন্যে নামানো হয়েছে। অপরিশোধিত ও আংশিক পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, ফুয়েল অয়েল, গ্যাস অয়েল এবং অন্যান্য ভারী তেলের ওপর শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সিএনজি, এনপিজি ও এলএনজির আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বিটুমিনাস খনিজজাত অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্যের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব রয়েছে।
জেট ফুয়েল, কেরোসিন, ন্যাফথা, মোটর ও এভিয়েশন স্পিরিট, হোয়াইট স্পিরিটসহ উড়োজাহাজের জ্বালানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব আছে। একই হার প্রযোজ্য হবে লাইট ডিজেল ও হাই-স্পিড ডিজেলের ক্ষেত্রেও।

