তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি খাতে প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। কয়েক বছরের ব্যবধানে এই বাজারে নেতৃত্বের জায়গায় বড় পরিবর্তন এসেছে। চার বছর আগে শীর্ষে থাকা বসুন্ধরা গ্রুপ এখন নেমে গেছে দ্বাদশ অবস্থানে। তিন বছর আগে বসুন্ধরাকে পেছনে ফেলে শীর্ষে ওঠে ওমেরা পেট্রোলিয়াম। আর চলতি অর্থবছরে সেই ওমেরাকেও ছাড়িয়ে প্রথমবারের মতো এলপিজি ব্যবসায় শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড।
শুধু শীর্ষস্থানেই নয়। এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সেরা দশের তালিকাতেও বড় রদবদল হয়েছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসে শীর্ষ দশ থেকে ছিটকে গেছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। দেশে এলপিজি সংকটের মধ্যেই বাজারের এই পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া গেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ৩২টির নিজস্ব সিলিন্ডার প্ল্যান্ট আছে। আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। এলপিজি ব্যবসার প্রতিটি ধাপেই সরকারের অনুমোদন নিতে হয়।
দেশে এলপিজি আমদানি হয় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং সীতাকুণ্ডের জেটি দিয়ে। এনবিআরের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ছয় মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৮৩ হাজার টন। এই আমদানি করেছে ১৬টি প্রতিষ্ঠান। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিকারকদের কাছ থেকে এলপিজি কিনে সিলিন্ডারে ভরে বাজারজাত করে।
দীর্ঘদিন এলপিজি আমদানিতে শীর্ষে ছিল বসুন্ধরা গ্রুপ। ২০২২–২৩ অর্থবছরে তারা প্রায় দুই লাখ টন এলপিজি আমদানি করে শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখে। তবে পরের বছর ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে শীর্ষে ওঠে ওমেরা পেট্রোলিয়াম। সে বছর বসুন্ধরা নেমে যায় চতুর্থ স্থানে। তাদের আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার টন।
২০২৪–২৫ অর্থবছরেও শীর্ষস্থান ধরে রাখে ওমেরা। তবে চলতি অর্থবছরের সাড়ে ছয় মাসেই সেই অবস্থান বদলে গেছে। এই সময়ে ১ লাখ ৮৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে শীর্ষে উঠে এসেছে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড। মোট আমদানির প্রায় ১৭ শতাংশ ছিল প্রতিষ্ঠানটির দখলে। তিন বছরে তাদের বাজার অংশীদারি বেড়েছে ৭ শতাংশ।
একসময় শীর্ষে থাকা বসুন্ধরা গ্রুপের বাজার অংশীদারি এখন নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে। আমদানির তালিকায় তাদের অবস্থান দ্বাদশ। অন্যদিকে, ওমেরা পেট্রোলিয়াম বর্তমানে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। তাদের বাজার অংশীদারি ১২ শতাংশ। তবে সম্প্রতি ফরাসি কোম্পানি টোটালগ্যাসের বাংলাদেশ কার্যক্রম অধিগ্রহণ করায় সামনে ওমেরার বাজার অংশীদারি বাড়তে পারে। এতে অর্থবছর শেষে শীর্ষস্থানের হিসাব আবারও বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির শীর্ষস্থানে ওঠা নিয়ে এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজি আমদানি বাড়াতে সরকারি অনুমোদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির আমদানির অনুমোদন বাড়ানো হয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে দ্রুত এলপিজি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। রোজার সময়ে যাতে কোনো সংকট না হয়, সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এলপিজি খাতে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি লিমিটেড। ইউনাইটেড গ্রুপ ও তুরস্কের আইগ্যাসের যৌথ উদ্যোগে গড়া এই প্রতিষ্ঠানের বাজার অংশীদারি তিন বছরে বেড়েছে ১১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসে তারা ১ লাখ ৭১ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। গত অর্থবছরে তাদের অবস্থান ছিল অষ্টম।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে গড়া যমুনা স্পেকটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ ৪৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে ১৪ শতাংশ বাজার অংশীদারি ধরে রেখেছে। নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের আরেক যৌথ উদ্যোগ বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড ১ লাখ ১১ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। তাদের বাজার অংশীদারি ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে।
এ ছাড়া শীর্ষ দশে থাকা পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, ল্যাফস গ্যাস বাংলাদেশ, প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস, ডেল্টা এলপিজি ও এসকেএস এলপিজির বাজার অংশীদারিও বেড়েছে।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর। বেসরকারি খাতই মূলত এই আমদানির ভার বহন করছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে এলপি গ্যাস আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টন। একই সময়ে সরকারি খাতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৯ হাজার ৪৭৯ টন। অর্থাৎ সরকারি খাতের বাজার অংশীদারি ১ শতাংশ। এর বাইরে তিনটি বেসরকারি রিফাইনারিতে উৎপাদিত এলপি গ্যাসও বাজারে সরবরাহ করা হয়।
খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি কোম্পানিগুলো বর্তমানে ছোট জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি করছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেশি পড়ছে। বড় জাহাজে এলপিজি আনা গেলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, দেশে এলপিজির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে আমদানিও। এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণ জরুরি। ৫০ হাজার টনের মতো বড় জাহাজে এলপিজি আনা গেলে টনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ ডলার সাশ্রয় হবে। এতে ভোক্তারাও উপকৃত হবেন। এ জন্য বেসরকারি খাতে টার্মিনাল তৈরিতে সরকারের জমি বরাদ্দ ও নীতিসহায়তা প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতেও সংকট এড়ানো কঠিন হবে।

