দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময় ঘনিয়ে আসলেও এখনো নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শ্রমিক অধিকারভিত্তিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল। সংগঠনটি বলছে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হলে এখনই মজুরি বোর্ড গঠন এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।
মঙ্গলবার শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি এ দাবি জানায়। তাদের মতে, পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমানে পোশাক খাতের নবীন শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর রয়েছে। তবে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা ও পুনর্নির্ধারণ করতে হয়। আগে এই সময়সীমা ছিল পাঁচ বছর। কিন্তু ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে তা কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সভাপতি কুতুব উদ্দিন আহমেদ চিঠিতে উল্লেখ করেন, সংশোধিত আইন অনুযায়ী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই তিন বছরের মেয়াদ পূর্ণ হবে। ফলে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত মজুরি বোর্ড গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সংগঠনটির মতে, নতুন মজুরি নির্ধারণ কোনো স্বল্প সময়ের কাজ নয়। এর জন্য প্রথমে মজুরি বোর্ড গঠন, সদস্য মনোনয়ন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গ্রহণ, গণশুনানি, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ প্রণয়নের মতো একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতেই উল্লেখযোগ্য সময় লাগে। তাই এখনই উদ্যোগ না নিলে আইনি সময়সীমা রক্ষা করা কঠিন হবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বর্তমান মজুরি দিয়ে অনেক শ্রমিকের জন্য পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি সমন্বয় না হলে শ্রমিকদের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।
সংগঠনটি মনে করে, দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্প অন্যতম প্রধান রপ্তানিমুখী খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি। এই শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য ও সময়োপযোগী মজুরি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ দক্ষ ও সন্তুষ্ট শ্রমিক ছাড়া উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়।
তারা আরও উল্লেখ করেছে, সময়মতো মজুরি পুনর্নির্ধারণ করলে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতির পাশাপাশি শিল্পে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে। ক্রেতাদের কাছেও শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ইতিবাচক বার্তা যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের সক্ষমতা এবং শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও বজায় থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক সংগঠনটির দাবি, সংশোধিত শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করা হোক, যাতে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই আইনসম্মতভাবে নতুন মজুরি ঘোষণা ও কার্যকর করা সম্ভব হয়।

