বাংলাদেশ ৩৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনের পথে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, শক্তিশালী রিজার্ভ তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং এ লক্ষ্য অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।
গতকাল সোমবার (১৯ জানুয়ারি) গুলশানের পুলিশ প্লাজায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) আয়োজিত ‘সিস্টেমেটিক এফোর্টস টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইকোনমিক পালস : ইমপোর্টেন্স অব পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই)’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা স্পষ্ট। অতীতে ঋণের অর্থ দিয়ে রিজার্ভ শক্তিশালী দেখানো হয়েছিল। একসময় দেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে বর্তমানে আইএমএফের ঋণের অর্থ ছাড়াই রিজার্ভ শক্তিশালী করার পথে বাংলাদেশ এগোচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মানি মার্কেট এখন ভালো সময় পার করছে। ডিসেম্বরে আমানত ৬ শতাংশ বেড়েছে। জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৮ দিনে রেমিট্যান্সে ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারকে শক্ত অবস্থানে নেওয়াই এখন মূল লক্ষ্য।
পিএমআই সূচক নিয়ে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, নীতিনির্ধারণে রিয়েল টাইম ডাটার গুরুত্ব অনেক। এই কাজ সহজ করেছে পিএমআই। সূচকটি দেশে নতুন হলেও এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এজন্য তিনি এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জকে ধন্যবাদ জানান এবং আশা প্রকাশ করেন, এই সূচক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনের ডেপুটি হাই কমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এ দেশে ব্রিটেনের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআই চেয়ারম্যান কামরান তানভিরুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে পিএমআই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশেও অর্থনীতির সক্ষমতা যাচাইয়ে এই সূচক কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পিএমআই সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, কোনো সূচকের মাধ্যমে একটি খাত বা অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা সহজেই বোঝা যায়। পিএমআইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান দেশি-বিদেশি সবাই জানতে পারছে। এতে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা পাচ্ছেন। সরকারি ডাটা অনেক সময় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে না। কিন্তু পিএমআইয়ের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত, যা দেশের সক্ষমতা ও বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করে।
এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে মাসিক ভিত্তিতে পিএমআই সূচক প্রণয়ন করছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ মাস ডিসেম্বর মাসে দেশের নির্মাণ খাত সংকুচিত হয়েছে। তবে প্রধান তিনটি খাতে সম্প্রসারণ দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে প্রধান চারটি খাতেই উন্নতি হয়েছে।
ডিসেম্বর মাসে দেশের পিএমআই মান ছিল ৫৪ দশমিক ২। নভেম্বর মাসে এ মান ছিল ৫৪। এতে বোঝা যায়, দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে, যদিও এই প্রবৃদ্ধির হার খুব বেশি নয়।
কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—এই চারটি প্রধান খাত নিয়ে প্রতি মাসে পিএমআই সূচক প্রকাশ করা হয়। সূচকের মান ৫০-এর ওপরে থাকলে সেই খাতের সম্প্রসারণ বোঝায়। আর ৫০-এর নিচে থাকলে তা সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। ডিসেম্বর মাসে কৃষি খাতের পিএমআই সূচক ছিল ৫৯ দশমিক ৬। উৎপাদন খাতে সূচকের মান ছিল ৫৮ দশমিক ২। নির্মাণ খাতে সূচক নেমে আসে ৪৯ দশমিক ৮-এ। সেবা খাতের সূচকের মান ছিল ৫১ দশমিক ৮।

