চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজের তীব্র সংকটে পণ্য খালাস কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহে শতাধিক মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষায় থাকলেও বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৪টিতে। এর মধ্যে ১৩৯টি জাহাজ গভীর সমুদ্রে এবং ১৫টি জেটে অবস্থান করছে। অপেক্ষমান জাহাজের মধ্যে ৬১টি খাদ্যপণ্যবাহী। বন্দরের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় জাহাজজট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস সূত্র জানায়, সাধারণ সময়ে একটি মাদার ভেসেল প্রায় ৫০ হাজার টন পণ্য নিয়ে বন্দরে এলে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে ৭ থেকে ১০ দিনে খালাস শেষ হয়। কিন্তু বর্তমানে লাইটারেজ সংকটের কারণে সময়সীমা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। অনেক জাহাজ ২০ থেকে ৩০ দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষা করছে। কিছু জাহাজ কয়েক দিন ধরে এক টন পণ্যও খালাস করতে পারছে না। দেশজুড়ে বর্তমানে ৭২০টি লাইটারেজ জাহাজ পণ্য নিয়ে অবস্থান করছে। এর মধ্যে ৩২০টি খাদ্যপণ্য, ১১৪টি সার, ৫০টি কয়লা এবং বাকি বিভিন্ন পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষমান।
আমদানিকাররা বলছেন, লাইটারেজ সংকটের কারণে প্রতিদিন একটি জাহাজের জন্য ১৫-২০ হাজার ডলার খরচ হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তা ও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে রমজানের সময় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে এই সমস্যা গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ১৫ ডিসেম্বর জাহাজ ‘জেমা’ কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে নোঙর করে ৬০ হাজার টন ভুট্টা নিয়ে। পরবর্তী এক মাসে অর্থাৎ ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৫ হাজার টন পণ্য খালাস করা সম্ভব হয়েছে। নাবিল গ্রুপের প্রতিনিধি সাইফুল আলম বাদশা বলেন, ‘লাইটারেজ জাহাজ না পাওয়ায় অধিকাংশ সময় খালাস বন্ধ থাকে। প্রতিদিন আমাদের ২০ হাজার ডলার ক্ষতি হচ্ছে। এই বৈদেশিক মুদ্রা শুধু লাইটারেজ সংকটের কারণে দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, যার চাপ ভোক্তা ও অর্থনীতির ওপর পড়বে।’
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএইচবিওএ) সভাপতি সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, ‘লাইটারেজ জাহাজের তীব্র সংকটে খালাস কার্যক্রম প্রায় স্থবির। জাহাজ আসছে দ্রুত, কিন্তু পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। সংকটের মূল কারণ চাহিদা ও সরবরাহের ভয়াবহ অসমতা। প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে ২০০ থেকে ৩০০টি লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন, কিন্তু এখন মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি পাওয়া যাচ্ছে। যে জাহাজ ১০ দিনে চলে যাওয়ার কথা, সেটি এখন ২৫ থেকে ৩০ দিন অপেক্ষায় থাকে।’
পণ্য খালাসে অচলাবস্থা নিরসনে নৌপরিবহন অধিদপ্তর গত মঙ্গলবার স্টেকহোল্ডারদের জরুরি বৈঠক করেছে। এতে বন্দর, কাস্টম, নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) ও বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মো. শফিউল বারী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে স্মরণকালের জাহাজজট হয়েছে। বর্তমানে ১৭২টি জাহাজ রয়েছে, এর মধ্যে ৬১টি ভোগ্যপণ্য নিয়ে খালাসের অপেক্ষা করছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনটি টাস্কফোর্স কাজ করবে।’
বিডব্লিউটিসিসি মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ১২০০টি লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ২৫০-৩০০টি মোংলা ও কিছু পায়রা বন্দরে গেছে। সাম্প্রতিক ঘন কুয়াশায় নদীপথে চলাচল ব্যাহত হয়েছে। দেশের ৪১টি ঘাটে ৭২০টি লাইটারেজ জাহাজ আটকে থাকার কারণে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

