বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একদিকে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে। ২০২৩ অর্থবছর থেকে দেশে প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এই মূল্যস্ফীতির হার বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক বেশি। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেখা গেলেও মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
একই সময়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে যেখানে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের হার আবারও বেড়েছে। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য কমানোর যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা এই পরিস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৃষি, শিল্প এবং সেবা—অর্থনীতির এই তিনটি প্রধান খাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। ফলে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যাতেও পরিণত হয়েছে। মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় জীবনযাত্রার চাপ বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতি কেন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে?
একটি দেশের বাজারে পণ্যের দাম মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। মানুষের হাতে অর্থের পরিমাণ যদি দ্রুত বাড়ে, কিন্তু সেই অনুযায়ী পণ্য ও সেবার উৎপাদন না বাড়ে, তাহলে সাধারণত মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ বাজারে অর্থের প্রবাহ এবং দেশের উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলেই দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
মূল্যস্ফীতি বোঝার ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ সম্পর্কিত একটি পুরোনো অর্থনৈতিক ধারণা রয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী, অর্থ সরবরাহ যে হারে বাড়ে এবং প্রকৃত উৎপাদন যে হারে বাড়ে, তাদের পার্থক্য মূল্যস্ফীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে, তবে বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে—এই বিষয়টি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সুদের হারকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যখন মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, তখন সুদের হার বাড়িয়ে ঋণ গ্রহণ ও মানুষের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়। এর ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পেছনে কী কাজ করেছে?
অর্থনীতিবিদ সাদিক আহমেদ তার ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত “বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা” বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ২০২২ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় সরকার যে বড় ধরনের প্রণোদনা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, তার অর্থায়নের পদ্ধতি এবং পরবর্তী সময়ে বাজেট ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত অর্থ সৃষ্টি বাজারে অর্থের পরিমাণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি খাতে ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি, সুদের হার নিয়ন্ত্রণের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের সম্প্রসারণ এবং ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
করোনার সময় অর্থনীতিকে সচল রাখতে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিতে ফেরার সময় বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
সুদের হার বাড়ানোর পরও মূল্যস্ফীতি কেন কমছে না?
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। সুদের হার নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক সুদহার চালু করা হয় এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে নতুন টাকা সৃষ্টি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে এবং পরে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই নীতিগুলো আরও কঠোর করা হয়।
মূল উদ্দেশ্য ছিল বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। তবে অনেকের প্রশ্ন, এত কঠোর নীতির পরও কেন মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে কমছে না?
এর মূল কারণ হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শুধু চাহিদার সমস্যা নেই, একই সঙ্গে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে মানুষের ব্যয়ের চাপ কমানোর চেষ্টা করা হলেও পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে ধরে রেখেছে।
সরবরাহ সংকট অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে
২০২২ অর্থবছর থেকে ২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৫১ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে উৎপাদন বা শিল্প খাতে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৭১ শতাংশ কমেছে।
একই সময়ে আমদানির পরিমাণও কমেছে। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও প্রযুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিরল। এই কারণেই শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয়
মূল্যস্ফীতি কমাতে শুধু মানুষের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করলে হবে না, একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের জন্য আমদানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, কারণ উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও প্রযুক্তির জন্য বাংলাদেশ অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
একই সঙ্গে এমন সময়ে ভোগ্যপণ্যের আমদানিতে অতিরিক্ত বাধা রাখা উচিত নয়, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বাজারে সরবরাহ বাড়ানো গেলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থ সরবরাহ ও ঋণ বৃদ্ধির নতুন চাপ
যদিও মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ সরবরাহ ও ঋণের প্রবৃদ্ধিতে আবারও বৃদ্ধি দেখা গেছে।
২০২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি কমলেও ২০২৬ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মোট ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরের ৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে ১০ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
এদিকে অর্থের ঘূর্ণন হারও বেড়েছে। ২০২৩ অর্থবছরে যেখানে এই হার ছিল ২ দশমিক ৪, ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে থাকা অর্থ দ্রুত লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সরকারি ঋণ ও মুদ্রানীতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রয়োজন
অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক সম্পদ ক্রয় এবং সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, কিন্তু সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে প্রায় ২৬ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরকারি ঋণ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে অর্থ প্রবাহ বাড়ছে।
এই দুই ধরনের নীতির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
শুধু সুদের হার কমালেই প্রবৃদ্ধি ফিরবে না
অনেকে মনে করেন, সুদের হার কমিয়ে দিলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা আরও জটিল। অনেক শক্তিশালী ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও ভালো ঋণগ্রহীতার অভাব রয়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা এখনো উচ্চ ব্যবসায়িক খরচ, জ্বালানি সংকট, দুর্বল বাণিজ্যিক অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না করে শুধু বাজারে অর্থ বাড়ানো হলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ফিরে আসবে না।
তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা বাড়ানো হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে যেসব খাতে প্রকৃত অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ প্রদান অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে পথ কী?
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ প্রয়োজন। শুধু অর্থের প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, আবার প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান করতে হবে এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনা। এই দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, নীতির মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে শুধু একটি পদক্ষেপ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং অর্থনীতির চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিককেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে।

