বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক সহায়তা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে সহায়তা ছাড়ের পরিমাণও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ফলে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, উন্নয়ন কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশের ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাংলাদেশ মোট ৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রধান উন্নয়ন অংশীদারের কাছ থেকে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম প্রতিশ্রুতি পাওয়া। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক, জাপান, চীন, ভারত এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের সহায়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় সামগ্রিক চিত্র দুর্বল হয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশীদার বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ৮২০ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে তাদের সর্বনিম্ন প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী জাপানের প্রতিশ্রুতি ছিল ৩১৪ মিলিয়ন ডলার।
এ সময় চীন ২৭৯ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ডলার এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ২৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সবচেয়ে বেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ২ দশমিক ৬৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি না আসায় সার্বিক বৈদেশিক সহায়তা কমেছে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক, জাপান, চীন, ভারত এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের কম প্রতিশ্রুতি সামগ্রিক চিত্রে বড় প্রভাব ফেলেছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও গত অর্থবছরে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশকে নতুন কোনো আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ আগের সরকার আমলে বিভিন্ন ঋণসুবিধা, অনুদান এবং প্রতিরক্ষা ঋণের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবকাঠামো, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা খাতে প্রায় ৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত।
এর মধ্যে ২০১০ সালে ১ দশমিক ০ বিলিয়ন ডলারের প্রথম ঋণসুবিধার আওতায় ২১টি উন্নয়ন ও পরিবহন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দ্বিতীয় ঋণসুবিধার আওতায় ২ দশমিক ০ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়। ২০১৭ সালে তৃতীয় ঋণসুবিধার আওতায় আরও ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, গত অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড়ের পরিমাণও কমেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে ৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থ ছাড় কমেছে ৪৯৪ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার।
অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ছিল শীর্ষে। সংস্থাটি ২ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। এরপর রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, যার অর্থ ছাড়ের পরিমাণ ১ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়া দিয়েছে ১ দশমিক ০৪৭ বিলিয়ন ডলার, জাপান ৭৯৫ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ৬৯৩ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ডলার এবং চীন ৫৩২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বাংলাদেশকে মোট ৪ দশমিক ৪৯৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার সুদ এবং ২ দশমিক ৯৫৩ বিলিয়ন ডলার মূল ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়া এবং একই সময়ে ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন অর্থায়নে ভারসাম্য রক্ষা আগামী দিনগুলোতে আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য নতুন অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাদের মতে, বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চাপ অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ধরে রাখা এবং অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

