২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে বেসরকারি খাতের পরিস্থিতি ভয়াবহ। বড় শিল্প উদ্যোক্তা থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—কেউই স্বস্তিতে নেই। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে এখন চলছে দোসর খোঁজার প্রতিযোগিতা।
সরল কথায়, যাদের কোনোভাবে আগের সরকারের সঙ্গে ছবি বা সংযোগ রয়েছে, তাঁদের দোসর বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। লোম বাছার মতো কম্বল উজাড় করা হচ্ছে। এসময় পুরো বেসরকারি খাতই লক্ষ্যবস্তু। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি চলছে। সুযোগ-সন্ধানীরা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হচ্ছে কোনো প্রমাণ ছাড়াই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহননের নোংরা খেলা চলছে। নতুন বিনিয়োগ নেই। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবকিছু রাজনৈতিক বিচারে না দেখলে পরিস্থিতি এতো জটিল হতো না। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড—সব দেশে সরকারের বদলের পর ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে রাখা হয়েছে। তারা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি।
বাংলাদেশে ভিন্ন চিত্র। ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গেলে সরকারি সঙ্গে সম্পর্ক বাধ্যতামূলক। লাইসেন্স বা গ্যাসের লাইন পাওয়ার জন্যও সরকারের সাহায্য প্রয়োজন। গত ১৫ বছরে কর্তৃত্ববাদী সরকারের সময়ে বেসরকারি খাতকে সহ্য করতে হয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। উদ্যোক্তারা শুধু নিজের নয়, হাজার হাজার কর্মীর ও দেশের অর্থনীতির কথা চিন্তা করেন। এ জন্য বেসরকারি খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি।
কিন্তু ৫ আগস্টের পর স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের দোসর বানিয়ে অর্থনীতিকে স্থবির করা হচ্ছে। ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময়ও এমন তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে শিল্প উদ্যোক্তাদের হয়রানি ও ব্যবসা ক্ষতি হয়েছিল। ফলে দেশ অন্তত ১৫ বছর পিছিয়ে গিয়েছিল।
আশা ছিল গণ আন্দোলনের পর নতুন সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে। কিন্তু গত ১৭ মাসে লুটেরা ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের একইভাবে দেখা হচ্ছে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এর ফলে পাচার হওয়া টাকাও ফেরেনি। বেসরকারি খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ফলস্বরূপ নতুন বিনিয়োগ হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.১ শতাংশে নেমেছে। এটি কভিডকালের দশমিক ০.২ শতাংশের চেয়েও কম। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪.৫ শতাংশ। ২০১৮-১৯ সালে ৮.৬ শতাংশে নেমেছিল। কভিডকালে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ০.২ শতাংশ। ২০২০-২১ সালে পুনরায় বেড়ে ৭.৮ শতাংশ। ২০২১-২২ সালে ১১.৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে ২.৯ শতাংশে ধস। ২০২৩-২৪ সালে ৪.৩ শতাংশে সামান্য উন্নতি। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সালে আবার ০.১ শতাংশে নেমেছে।
নতুন বিনিয়োগ থেমে গেছে। শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতে উদ্যোগ নেই। ব্যাংক থেকে ঋণের চাহিদা প্রায় শূন্যে। পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, বিদ্যমান ব্যবসা বাঁচাতে ব্যস্ত। সরকারও দিকনির্দেশনা দিচ্ছে না। ফলে বেসরকারি খাত এখন সর্বনাশের কিনারে।

