ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদের বিদ্যুৎ চুক্তি বাংলাদেশে বড় অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জাতীয় কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাক্তিগত আইনের আওতায় বনায়া বিদ্যুৎ চুক্তিগুলোতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের এসএস পাওয়ারও অসম চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বছরে বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
গত রোববার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে জাতীয় কমিটি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, আদানির চুক্তির কারণে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এটি সরকারের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

কমিটির সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, “আদানির চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য মিলেছে। এগুলো আদানিকে জানিয়ে ব্যাখ্যা নেওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সিঙ্গাপুরে চুক্তি সংক্রান্ত সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, বিলম্ব হলে মামলা আইনি কারণে দুর্বল হয়ে যাবে। লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।
এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত থেকে আটজন ব্যক্তির অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এখানে কয়েক মিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া হয়েছে। দুদক ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় এই চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কমিটি গঠন করে। পরে ২০২১ সালে আইনটি ‘ইনডেমনিটি আইন’ হিসেবে সংশোধন করা হয়।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে প্রথমে দুই বছরের জন্য আইন প্রণয়ন করে। পরে ২০১২ সালে দুই বছর, ২০১৪ সালে চার বছর, ২০১৮ সালে তিন বছর এবং সর্বশেষ ২০২১ সালে পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ানো হয়। চব্বিশের আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে। অন্য সদস্যরা হলেন:
- বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী
- কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ
- বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন
- অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান
কমিটি যেকোনো সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ, নথি নিরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে আহ্বান এবং চুক্তিতে সরকারের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে কি না তা যাচাই করতে পারবে।
দর উঠেছে দ্বিগুণের ওপরে:
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি বাংলাদেশের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। সরকারের অন্যান্য উৎসের সঙ্গে তুলনায় আদানির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৪–৫ সেন্ট বেশি দিতে হচ্ছে।
কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির সঙ্গে চুক্তি শুরু হয়েছিল প্রতি ইউনিট ৮.৬১ সেন্টে। শর্ত অনুযায়ী দাম ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১৪.৮৭ সেন্টে। এর ফলে বছরে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার দিতে হচ্ছে, যা চুক্তি বহাল থাকলে ২৫ বছর ধরে পরিশোধ করতে হবে।
কমিটির প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। মামলার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় সীমিত। আমরা চাই পরবর্তী সরকার এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নিক।”
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন জানান, অর্থবছর ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) পরিশোধিত অর্থ ১১ গুণ বেড়েছে। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চারগুণ। পিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান করছে। ২০২৫ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুতের চুক্তি বাজারদরের চেয়ে ৭০–৮০ শতাংশ বেশি, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের খরচ ৪০–৫০ শতাংশ বেশি এবং বিনা টেন্ডারের গ্যাস প্রকল্পে বিদ্যুতের দাম ৪৫ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে। কমিটির হিসাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে বছরে ৯০ কোটি থেকে ১১৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ঘাটতি সামাল দিতে হলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। এতে শিল্পখাত ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে।
বিদ্যুৎ খাতে আদানির চুক্তি চাপ সৃষ্টি করছে:
২০২৪ সালের হিসাবে আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ বাংলাদেশের অন্যান্য উৎসের চেয়ে ৪–৫ টাকা বেশি পড়ছে। যদিও এর একটি অংশ কয়লার মূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, বড় অংশ এসেছে চুক্তির একতরফা শর্ত, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, কর এবং ঝুঁকি সরকারের ওপর চাপানোর কারণে।
বিদ্যুৎ না নিলেও ‘টেক-অর-পে’ শর্তে পুরো অর্থ দিতে হচ্ছে। ডলারের সঙ্গে মূল্য যুক্ত থাকায় মুদ্রাস্ফীতি ও কয়লার দামের ওঠানামা সরাসরি সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে। এছাড়া ভারতের রাজনৈতিক বা আইনগত কোনো পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাংলাদেশের ওপর প্রতিফলিত হচ্ছে। রোববার আদানি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এখনও জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন পায়নি। বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তাই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবেদন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে পারছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অসম চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বছরে প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে সামিটকে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার প্রকল্পেও এক মাসের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ৩৯২ কোটি টাকা। ২৫ বছরে এর পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১.১৭ ট্রিলিয়ন টাকা। ২০২৪ সালের জুনে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ ১৬.২৬ টাকা, যা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের গড় খরচের দ্বিগুণেরও বেশি।
যা সুপারিশ করেছে কমিটি:
জাতীয় কমিটি সতর্ক করে জানিয়েছে, দেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘমেয়াদে বড় আর্থিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। চলমান আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে তারা একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেসব চুক্তিতে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এছাড়া উচ্চব্যয় এবং অসম বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিগুলোকে পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে। বিশেষভাবে যেসব চুক্তিতে ব্যবহারের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট রয়েছে এবং যেগুলো বৈদেশিক মুদ্রার হারের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো অগ্রাধিকার পাবে।
ভবিষ্যতে নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি একটি স্বাধীন জ্বালানি তদারকি ও তদন্ত প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। তারা মনে করছেন, এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
কমিটি সতর্ক করে জানিয়েছে, আদানির মতো বড় ও ‘অসম’ চুক্তি বাতিল বা চ্যালেঞ্জ করলে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে দেশে বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি রয়েছে।
এ বাস্তবতা মাথায় রেখে কমিটি জনমত তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে এবং আগামী ২৫ বছরের জন্য ‘অভিশপ্ত’ চুক্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। কমিটির মতে, তা না হলে উচ্চমূল্যের বিদ্যুতের চাপ শিল্পায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

