সরকার দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে সামরিক শিল্পাঞ্চল গড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাতিল হওয়া ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জায়গায় এই শিল্পাঞ্চল স্থাপন করা হবে। গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভা শেষে রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এ তথ্য জানান। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সভায় আনোয়ারায় ফ্রি ট্রেড জোন ও কুষ্টিয়া সুগার মিলকে ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পৌরসভার ভেতরেও নতুন ইকোনমিক জোন স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জাপানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার বিষয়েও সম্মতি পাওয়া গেছে।
সেদিন বেজা ছাড়াও বিডা ও মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিডার গভর্নিং বোর্ডে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রবাসীদের ১.২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া সরকার চীনসহ অন্যান্য দেশে বিডার এজেন্সি অফিস খোলার এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আশিক চৌধুরী জানান, মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এনএসইজেড) প্রায় ৮৫০ একর জমিকে ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ হিসেবে বেজার মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলকে জি-টু-জি কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গাকেই এখন প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য একাধিক রাষ্ট্রীয় কারখানা গড়ে তোলা নয়। বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে প্রযুক্তি বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষাশিল্পে সক্ষমতা তৈরি করাই প্রধান উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সুযোগও থাকবে। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাতের উদাহরণ দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্রের চেয়ে গোলাবারুদ ও মৌলিক সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতিই বড় সমস্যা। এতে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আশিক চৌধুরী জানান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। পুরো ৮৫০ একর জমিতে একসঙ্গে কার্যক্রম শুরু করা হবে না। আগামী পাঁচ বছরে সীমিত পরিসরে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে। সম্ভাব্য অংশীদার দেশ বা পণ্যের বিষয়ে এখন বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও প্রকল্পটি চলমান থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, দেশে প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) গঠনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ৬০০–৬৫০ একর জমিতে এটি গড়ে তোলা হবে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ফ্রি ট্রেড জোন কার্যত ‘ওভারসিজ টেরিটরি’ হিসেবে পরিচালিত হবে। এখানে কাস্টমস বাধ্যবাধকতা ছাড়াই পণ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানি করা যাবে। ফলে বাংলাদেশের ‘টাইম টু মার্কেট’ সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
দুবাইয়ের জেবেল আলি ফ্রি জোনের মডেল অনুসরণ করে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি। প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

