নির্বাচনের সময় কেন হঠাৎ বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, বিনিয়োগ কেন থমকে যায়—এই প্রশ্ন নতুন নয়। সাধারণত ভোটের আগে অর্থনীতিতে কৃত্রিম চাঙাভাব দেখা যায়, আর ভোট শেষে শুরু হয় কঠোর বাস্তবতা। অর্থনীতিবিদরা একে ‘পলিটিক্যাল বিজনেস সাইকেল’ বলে অভিহিত করেন। এই চক্রে কখনো অর্থনীতিতে বিরাট উত্থান হয়, কখনো আচমকা পতন। পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নির্ভর করে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর।
নির্বাচনকালীন অর্থনীতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য:
১. সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধি: নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন সরকার সাধারণত জনপ্রিয় হতে চায়। তাই তারা:
- নতুন অবকাঠামো প্রকল্প যেমন রাস্তা, সেতু দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করে।
- সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ভাতার পরিমাণ বাড়ায়।
- মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়ায়।
২. শেয়ার বাজারে অস্থিরতা: নির্বাচনের ফলাফল এবং নতুন সরকারের নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে। ফলে:
- নির্বাচনের আগ মুহূর্তে শেয়ার বাজারে বড় ওঠানামা দেখা যায়।
- বড় কোম্পানি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো বড় প্রকল্পে হাত না দিয়ে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি গ্রহণ করে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কিছুটা কমে যায়।
৩. মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের চাহিদা: নির্বাচনী প্রচারণার সময় নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ে। এতে:
- পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়ে যায়।
- খাদ্যদ্রব্য, পরিবহন এবং প্রচারণা সংক্রান্ত শিল্প চাঙা হয়।
- অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে বাড়তে পারে।
৪. মুদ্রা পাচার ও ক্যাপিটাল ফ্লাইট: উন্নয়নশীল দেশে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা থাকে। ফলে:
- ধনী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেন।
- স্থানীয় মুদ্রার মান কিছুটা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৫. নির্বাচনের পর কঠোর নীতি: নির্বাচন শেষে সরকার প্রায়শই ব্যয় সামলাতে:
- নতুন কর আরোপ করে।
- ভর্তুকি কমিয়ে দেয়।
- কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটে।
সহজ কথায়, নির্বাচনের সময় অর্থনীতিতে ‘কৃত্রিম চাঙাভাব’ দেখা দেয়। তবে এর আড়ালে থাকে গভীর অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি।
দেশে দেশে নির্বাচনকালীন অর্থনীতি:
যুক্তরাষ্ট্র:
নির্বাচনের সময় পুঁজিবাজার অস্থির হয়। বিনিয়োগকারীরা ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন। রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—কারা ক্ষমতায় আসবে তার ওপর কর নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ট্রাম্পের সম্ভাব্য জয় এবং তার সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতির প্রভাবে ভোটের আগে থেকেই মুদ্রার মানে অস্থিরতা দেখা দেয়। অনেক বিনিয়োগকারী নিরাপদ বিনিয়োগ যেমন সোনা বা ট্রেজারি বন্ডে ঝুঁকেছিলেন।
ভারত:
নির্বাচনের সময় অর্থনীতির চাকা দ্রুত ঘোরে। সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের কারণে ভোগব্যয় বেড়ে যায়, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে নির্বাচনের পর অনেক সময় কঠোর রাজস্ব নীতি নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ:
উদীয়মান অর্থনীতিতে নির্বাচনের সময় চ্যালেঞ্জ বেশি। ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা করেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। যদিও এই সংকট নির্বাচনের কারণে সৃষ্টি হয়নি, নির্বাচনকালীন অনিশ্চয়তা সংকটকে ঘনীভূত করেছিল। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়।
নির্বাচনের পরে:
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্যমতে, নির্বাচনের আগে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায়। নির্বাচনের পর স্থিতিশীলতা ফিরলে অর্থনীতি আবার গতি পায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনের সময় সাময়িক অস্থিরতা দেখা দিলেও টেকসই উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ জরুরি। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত পরবর্তী কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধির দিক নির্ধারণ করে।

