অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি সংকট কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় দুটোই কমেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) দেশে ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ১৯৯ কোটি ডলার। তুলনা করলে দেখা যায়, গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল প্রায় ২২৯ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। বিশেষ করে বাংলাদেশের চারটি প্রধান উন্নয়ন সহযোগী দেশ থেকে এই সময়কালে কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি মেলেনি।
ঋণের অর্থছাড়ও কমেছে। চলতি ছয় মাসে বাংলাদেশে ঋণের অর্থ এসেছে ২৪৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণের অর্থ পড়েছিল ৩৫৩ কোটি ২৪ লাখ ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমার মূল কারণ দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতি। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে ধীর করে দিয়েছে।
এই ঋণের মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ১২৬ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ১ কোটি ৮৪ লাখ ডলার এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থা থেকে এসেছে ৭০ কোটি ১৮ লাখ ডলার। কিন্তু ভারতের, চীনের, রাশিয়ার ও জাপানের মতো প্রধান উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো এই ছয় মাসে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) থেকেও কোনো নতুন ঋণ পাওয়া যায়নি।
যদিও নতুন ঋণ কম এসেছে, আগের দেওয়া ঋণের অর্থছাড় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে বিদেশী ঋণের অর্থ এসেছে ২৪৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে রাশিয়া সর্বোচ্চ ৫৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার অর্থ ছাড় করেছে। সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে আইডিএ, প্রায় ৫৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এছাড়া এডিবি ৫১ কোটি ৯১ লাখ, এআইআইবি ২ কোটি ৯১ লাখ, জাপান ১২ কোটি ১৮ লাখ, ভারত ১০ কোটি ৪৬ লাখ এবং চীন ২২ কোটি ডলার দিয়েছে। অন্যান্য দেশ ও সংস্থা থেকে এসেছে ৩৭ কোটি ৯৩ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলছেন, বিদেশী ঋণ কম আসার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতি বড় কারণ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, “অনেক উন্নয়ন সহযোগী দেশ ঋণ অনুমোদন করলেও তা দ্রুত ছাড়ছে না, আবার কেউ নতুন ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। দাতা দেশগুলো সাধারণত কোনো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ সরকার ব্যবস্থার দিকে নজর রাখে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা মূলত ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতি অনুসরণ করছে।”
ড. ফাহমিদা আরও বলেন, “বিদেশী ঋণের এই ধারা যদি নির্বাচনের পরও অব্যাহত থাকে, তাহলে নতুন সরকারের জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সময়মতো ঋণ না এলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই পরবর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও তৎপরতা বাড়ানো।”

