আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলমান অর্থনৈতিক চাপে ভোটারদের সামনে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন তুলে ধরতেই তারা এই কৌশল নিয়েছে।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী এই দুই দলের ইশতেহারে অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে বড় লক্ষ্য ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি ধাপে ধাপে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার রূপরেখা দিয়েছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তবে লক্ষ্য বাস্তবায়নের কৌশল স্পষ্ট নয়।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা—এই চারটি মূল স্তম্ভকে কেন্দ্র করে উভয় দল দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধুমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট পথনকশা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তব নীতি, ধারাবাহিক সংস্কার এবং সুশাসনই নির্ধারণ করবে আগামীতে দেশের অর্থনীতি কোন পথে যাবে। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা শুরু হবে, যেখানে অর্থনীতিই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং প্রত্যাশার ক্ষেত্র।
২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিএনপি
বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি ইশতেহার তুলে ধরা হয়।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, জনগণের ভোটাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কূটনীতিক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
উৎপাদন ও কর্মসংস্থান:
ইশতেহারে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইসিটি খাতে এক মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তরুণদের জন্য কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্টার্টআপ সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি সম্প্রসারণে আঞ্চলিক ই-কমার্স হাব গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম, যেমন পেপাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজস্ব কাঠামো সংস্কার:
বিএনপি জানিয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে এটি ৭ শতাংশের নিচে। তবে করের বোঝা বাড়ানো হবে না। বরং কার্যকর ও বাস্তব উদ্যোগের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো হবে।
কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা:
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের জন্য ‘ফারমার্স কার্ড’ থাকবে। এর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য, ভর্তুকি, কৃষিঋণ, বিমা ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সুবিধা মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হবে।
বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও সবুজ অর্থনীতি:
ইশতেহারে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। সঞ্চালন লাইন বাড়ানো হবে ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের অংশ হিসেবে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা আছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় থ্রি-আর (রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল) নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি:
বিএনপি সৃজনশীল অর্থনীতিকে ভবিষ্যতের নতুন খাত হিসেবে তুলে ধরেছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, থিয়েটার, অ্যানিমেশন, ভিএফএক্স, গেমিং ও ডিজিটাল কনটেন্ট খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাত থেকে জিডিপির ১.৫ শতাংশ এবং ৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে।
সামগ্রিক লক্ষ্য:
ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিএনপির লক্ষ্য বাংলাদেশকে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা। দলটির ভাষায়—“উৎপাদন, লুট নয়; অধিকার, ভয় নয়; ন্যায়বিচার, বৈষম্য নয়।”
বেসরকারি সংস্থা সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নীতি ও পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে এবং গোষ্ঠী স্বার্থ প্রাধান্য পাবে না। তবে অর্থনীতির তৎকালীন জরুরি পদক্ষেপগুলো এখনও বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়নি।
জামায়াতে ইসলামের ইশতেহার: ২ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য:
জামায়াতে ইসলামী ৪১ দফা নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষণা করেছে, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যও রেখেছে। দেশকে বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২০তমে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ:
আগামী পাঁচ বছরে আধুনিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। আমদানি নির্ভরতা ৩০ শতাংশ কমানোর কথাও বলা হয়েছে।
তবে এফডিআই বর্তমান অবস্থায় বার্ষিক ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে প্রস্তাবিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে নিয়ে আসার কথা বলা হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আমদানি নির্ভরতার কারণে তা সহজ হবে না।
করনীতি ও রাজস্ব:
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা এবং করপোরেট কর ২০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব আছে। তবে রাজস্ব আহারের জন্য স্পষ্ট কৌশল নেই।
কর্মসংস্থান:
৭ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা এসেছে। যা বাস্তবায়নের জন্য সময়কাল, খাতভিত্তিক পরিকল্পনা এবং বাস্তব হিসাব জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, আইসিটি ও এসএমই খাতকে গুরুত্ব দেওয়ায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
আর্থিক খাত ও ইসলামী ব্যাংকিং:
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ও বিমা খাতের উন্নয়নের অঙ্গীকারও করা হয়েছে। তবে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও পরিচালন দুর্বলতা সমাধানের স্পষ্ট নীতিগত কৌশল নেই।
সামাজিক ব্যয় ও কল্যাণ:
বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, স্বল্পমূল্যের আবাসনসহ বিস্তৃত কল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ব্যয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত না হলে বাজেট ঘাটতির চাপ বাড়বে।
সার্বিক মূল্যায়ন:
জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারে অর্থনীতি নিয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সময়সীমা, অর্থায়ন কাঠামো ও বাস্তবায়ন কৌশল স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ আস্থা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে কতটা বাস্তব রূপ পাবে।

