একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার ওপর, আর সেই শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর হলো বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেই গড়ে ওঠার কথা দেশের আগামী দিনের চিন্তাশীল নাগরিক, গবেষক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, অর্থনীতিবিদ ও দক্ষ জনশক্তি। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির কেন্দ্র, উন্নয়নের ভিত এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও কি তার মান একইভাবে এগোচ্ছে?
সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২টায় প্রকাশিত আলোচনায় যে বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা গভীরভাবে ভাবার মতো। দেশে বর্তমানে ৫৮টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। পাশাপাশি আছে ১১০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সংখ্যার হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে উচ্চশিক্ষার বিস্তারের একটি চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু সংখ্যার এই বৃদ্ধি মানেই যে শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন, তা বলা কঠিন। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষকসংখ্যা, অবকাঠামো এবং একাডেমিক গভীরতা বাড়ছে না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নামের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হয় না। সেখানে থাকতে হয় শক্তিশালী পাঠক্রম, যোগ্য শিক্ষক, গবেষণার সুযোগ, আধুনিক পাঠাগার, প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার, শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ, আবাসনের ব্যবস্থা, সুস্থ খাবার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চার মুক্ত পরিবেশ। কিন্তু দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মৌলিক বিষয়গুলোই এখনও দুর্বল। নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে, কিন্তু সেসব বিভাগে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, কোথাও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, কোথাও আবার গবেষণার ন্যূনতম সুবিধাও অনুপস্থিত। ফলে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও তার ভেতরের শক্তি গড়ে উঠছে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, মানের পরিবর্তে যদি শুধু সংখ্যাকে সাফল্য হিসেবে ধরা হয়, তাহলে একসময় এই শিক্ষার মূল্য কমে যাবে। তখন ডিগ্রি থাকবে, কিন্তু সেই ডিগ্রির সঙ্গে বাস্তব জ্ঞান, দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা বা নতুন কিছু সৃষ্টি করার সক্ষমতা যুক্ত থাকবে না। শিক্ষার্থীরা সনদ নিয়ে বের হবে, কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো প্রস্তুতি তাদের থাকবে না। এর ফল হিসেবে দেশে মেধার অপচয় বাড়বে, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হবে, আর মেধাবীরা সুযোগের খোঁজে দেশের বাইরে চলে যেতে চাইবে।
উচ্চশিক্ষার পাঠক্রম নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাগত বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি, পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা বদলানো জরুরি। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, পাঠ্যক্রম এখনও পুরোনো কাঠামোয় আটকে আছে। পাঠদান অনেক সময় মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষা-কেন্দ্রিক এবং চিন্তাশক্তির বিকাশে বাধাগ্রস্ত। ফলে শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের চাহিদা, কাজের ক্ষেত্রের প্রয়োজন কিংবা নতুন উদ্ভাবনের জগতে প্রবেশ করার মতোভাবে গড়ে উঠতে পারে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একরকম নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো মান ধরে রাখার চেষ্টা করলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যখন শিক্ষা একটি দায়বদ্ধ সামাজিক বিনিয়োগের জায়গা থেকে সরে গিয়ে কেবল আয়ের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক। অন্যদিকে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঐতিহ্য, মেধাবী শিক্ষার্থী এবং সামাজিক মর্যাদার জায়গা ধরে রাখলেও সেগুলোর মধ্যেও সেশনজট, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা হয়ে আছে।
সেশনজট বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এক দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা। একটি শিক্ষাবর্ষ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে তার প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিক্ষার্থীর জীবন পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান, মানসিক অবস্থা এবং সামাজিক অবস্থান—সবকিছুর ওপর পড়ে। একজন শিক্ষার্থী যদি জানতেই না পারে তার পড়াশোনা কবে শেষ হবে, তাহলে তার মধ্যে হতাশা জন্ম নেওয়া স্বাভাবিক। এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা উচ্চশিক্ষাকে অনেকের কাছে সম্ভাবনার বদলে বোঝা করে তোলে।
এখনও দেশের শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ তুলনামূলকভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখানেই ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি এই আকর্ষণ ধরে রাখতে হলে শুধু ভর্তি পরীক্ষার কঠোরতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ভেতরের শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়ন। একজন শিক্ষার্থী যদি ক্যাম্পাসে ভালো পাঠাগার না পায়, পর্যাপ্ত শিক্ষকের সংস্পর্শ না পায়, গবেষণার সুযোগ না পায়, আবাসনের নিশ্চয়তা না পায়, তাহলে সে কেবল একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েই তার প্রকৃত বিকাশ ঘটাতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান খুব শক্ত নয়। বৈশ্বিক তালিকায় ভালো অবস্থানে না থাকা কেবল ভাবমূর্তির প্রশ্ন নয়; এর পেছনে থাকে গবেষণার দুর্বলতা, মানসম্মত পাঠদানের অভাব, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, জ্ঞানসৃজনের স্বল্পতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যদি বিশ্বপরিসরে শক্ত অবস্থান নিতে না পারে, তাহলে সেই দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার পথও দুর্বল হয়ে পড়ে।
শিক্ষকসংকটও একটি বড় সমস্যা। আদর্শ অনুপাতে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক থাকা উচিত। কিন্তু দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অনুপাত মানা হয় না। ফলে একজন শিক্ষককে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়, শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় মনোযোগ পায় না, গবেষণা তদারকি দুর্বল হয়, এবং শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত আলোচনা গড়ে ওঠে না। বিশ্ববিদ্যালয় তখন জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র হওয়ার বদলে কেবল পাঠ শেষ করার জায়গায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
তবে শুধু শিক্ষক বা পাঠ্যসূচিই নয়, শিক্ষার্থীদের মৌলিক জীবনযাত্রাও উচ্চশিক্ষার মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। পাঠাগার, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, নিরাপদ আবাসন, যাতায়াতের সুযোগ—এসবের সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো পুষ্টিকর খাবার। দেশের ভবিষ্যৎ যাদের হাতে, তারা যদি নিম্নমানের খাবার খেতে বাধ্য হয়, তাহলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ উভয়ই বাধাগ্রস্ত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, ভোজনালয় ও খাদ্যকক্ষে ভর্তুকি বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা তাই বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
আবাসন সংকটও শিক্ষার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে। অনেক শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়, কেউ কেউ সাধারণ কক্ষে রাত কাটায়, অনেকের পড়াশোনার জন্য নিরিবিলি পরিবেশ থাকে না। এভাবে চলতে থাকলে মেধাবী শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে ক্লান্ত ও নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফল করার জন্য কেবল বই পড়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং মনোযোগী জীবনযাপনের পরিবেশ। সেই পরিবেশ না থাকলে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত মান অর্জন করা কঠিন।
শিক্ষক নিয়োগে মেধাকে একমাত্র মানদণ্ড করা এখন সময়ের দাবি। যোগ্য শিক্ষক ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কখনও মানসম্পন্ন হতে পারে না। শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না; তিনি নতুন চিন্তার পথ খুলে দেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখান, গবেষণায় আগ্রহ তৈরি করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেন। তাই সরকারি ও বেসরকারি—সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ স্বচ্ছ, কঠোর এবং মেধাভিত্তিক হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও দরকার, যাতে তারা নতুন পাঠদান পদ্ধতি, গবেষণা পরিচালনা এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখতে পারেন।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, নাকি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন? বাস্তবতা বলছে, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শক্তিশালী করা এখন অনেক বেশি জরুরি। কারণ, যদি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরই পর্যাপ্ত শিক্ষক, নিজস্ব ক্যাম্পাস, পরীক্ষাগার, আবাসন ও পাঠাগার না থাকে, তাহলে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে পুরোনোগুলোর ভিত মজবুত করাই বেশি কার্যকর হবে। শুধু পরিমাণ বাড়ালে দৃশ্যত অগ্রগতি দেখা যায়, কিন্তু গুণগত উন্নয়ন না হলে সেই অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
উচ্চশিক্ষার সংস্কারে কয়েকটি বিষয় জরুরি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রথমত, পাঠদান ও শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতি আধুনিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাঠাগার, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা এবং গবেষণার পরিসর বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের আর্থিক বাধা কমাতে হবে, যাতে অর্থসংকট শিক্ষার পথে বড় বাধা না হয়। চতুর্থত, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। পঞ্চমত, আবাসন, যাতায়াত এবং ক্যাম্পাসে ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শুধু রুটিন দায়িত্ব পালন করলেই হবে না; ভবিষ্যৎভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে গবেষণা, আলোচনাচক্র, পাঠাগার, আধুনিক জ্ঞানবিনিময় এবং নতুন ধারণার সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যুক্ত রাখে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সেই দিকেই এগোতে হবে। উচ্চশিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের পথ হিসেবে দেখা বন্ধ করে জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা—এই তিন স্তরকেই একসঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, নিচের স্তরের দুর্বলতা ওপরের স্তরে এসে আরও বড় সংকট তৈরি করে। তাই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নকে আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, তাহলে এখনই উচ্চশিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো সহজ, কিন্তু তার মান ধরে রাখা কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটিই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ আজকের বিশ্ববিদ্যালয় যেমন হবে, আগামীর বাংলাদেশও তেমনই গড়ে উঠবে।

