সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ছয়টি শ্রেণিতে ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান চলছে মাত্র একজন শিক্ষককে দিয়ে। ফলে একটি শ্রেণিতে পাঠদান চলাকালে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বসে বসে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গত এক মাস ধরে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চলছে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম।
হাওরবেষ্টিত চামরদানী ইউনিয়নের দক্ষিণ আমজোড়া গ্রামে অবস্থিত বিদ্যালয়টি ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৩ সালে সরকারি হয়। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকে ৯ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৮ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৯ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর থেকে কাগজে-কলমে মাত্র একজন শিক্ষক পদায়ন রয়েছে। পরে বিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকও কার্যত অনুপস্থিত হয়ে পড়েন। পাঠদান সচল রাখতে পাশের দুটি বিদ্যালয় থেকে দুই সহকারী শিক্ষককে সংযুক্ত করা হলেও তাঁদের একজন দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। ফলে ১ জুলাই থেকে কার্যত একজন শিক্ষকই পুরো বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে সংযুক্ত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সহকারী শিক্ষক পারভীন আক্তার বলেন, একা ৫০ জন শিক্ষার্থীকে সামলানো অত্যন্ত কঠিন। ছয়টি শ্রেণিতে আলাদাভাবে পাঠদান করা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে পাঠদান, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
|
অন্যদিকে সংযুক্তির নির্দেশ পাওয়া সহকারী শিক্ষক শেখ মহসীন কবীর জানান, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে তিনি নিজ কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করছেন। সংযুক্তির আদেশ বাতিলের জন্য তিনি আবেদন করবেন বলেও জানান।
বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকসংকট নতুন নয়। ২০২০ সালের পর একাধিক শিক্ষক বদলি, অব্যাহতি ও মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার কারণে বারবার সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন, যা আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষক না থাকায় শিশুদের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জসীম মিয়া এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক মজনু মিয়া বলেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ সময়ই শ্রেণিকক্ষে বসে থাকে বা খেলাধুলায় সময় কাটায়। এতে শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে এবং উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে।
মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থা ও থাকার অনুপযুক্ত পরিবেশের কারণে অনেক শিক্ষক এখানে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে চান না। বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প নেই।
শুধু দক্ষিণ আমজোড়া নয়, পুরো মধ্যনগর উপজেলাতেই শিক্ষকসংকট প্রকট। উপজেলায় ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ৩৮৬টি পদের মধ্যে ৭৭টি শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের ৩৮টি পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি। পাঁচটি বিদ্যালয়ে মাত্র একজন করে শিক্ষক কর্মরত থাকায় পাশের বিদ্যালয় থেকে সংযুক্তির মাধ্যমে পাঠদান চালানো হচ্ছে।
|
একই ধরনের সংকটে রয়েছে আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। সেখানে চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও তিন বছর ধরে একজন শিক্ষক দিয়েই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছৈয়দা সাদিয়া আক্তার বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল বলেন, জেলার শিক্ষকসংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি এবং সহকারী শিক্ষক পদায়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলোয়ার হোসেন বলেন, হাওরাঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে উপস্থিতিও কমে যায়। পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

