২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের নানা দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে; অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতকার্য হতে পারেনি।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যেখানে ২০২৫ সালে ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। একই সঙ্গে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও এক বছরে ১৯ হাজারের বেশি কমেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে—দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি। বিপরীতে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৯৮৪টি থেকে কমে হয়েছে ৬৬৯টি। এই পরিসংখ্যানকে কেবল শিক্ষার্থীদের মেধা বা পরিশ্রমের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হবে না।
ফলাফলের এই পতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন ও পরীক্ষায় তুলনামূলক কঠোরতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। সরকারি শিক্ষা-পর্যালোচনায়ও বলা হয়েছে, পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের কঠোরতা, মডারেশন ও পরীক্ষাপদ্ধতির প্রয়োগের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালে যেখানে এসএসসি পাসের হার ৮৩ শতাংশের ওপরে ছিল, ২০২৫ সালে তা ৬৮ শতাংশের ঘরে নেমে আসে; এবার আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে এটি শুধু এক ব্যাচের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার ফল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। বরং পরীক্ষার মানদণ্ড কতটা কঠোর হয়েছে এবং আগের বছরগুলোর তুলনায় মূল্যায়নের ধরন কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
তবে কঠোর মূল্যায়নকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ, ফলাফলের সঙ্গে দেশের শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন-দক্ষতার দীর্ঘদিনের সংকটেরও যোগ রয়েছে। সরকারি শিক্ষা-পর্যালোচনায় জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্তরেই বাংলা ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার হার প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় কম। অথচ পাবলিক পরীক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পাসের হার ও বিপুলসংখ্যক জিপিএ–৫ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পরীক্ষার সনদ আর প্রকৃত শেখার সক্ষমতার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এবার তুলনামূলক কঠোর মূল্যায়ন সেই ব্যবধানের কিছুটা বাস্তব চিত্র প্রকাশ করে থাকতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার মানের বৈষম্য। রাজধানী বা বড় শহরের নামী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো, পাঠদানের পরিবেশ, প্রযুক্তি-সুবিধা এবং অতিরিক্ত একাডেমিক সহায়তার তুলনা চলে না। এবারের ৩১২টি শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা, ৫৭টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠান এবং ২৯টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের হওয়া এই বৈষম্য নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। একটি প্রতিষ্ঠানের একজনও শিক্ষার্থী পাস না করলে সেখানে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করার আগে শিক্ষক, পাঠদান, একাডেমিক তদারকি, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা—সবকিছু পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আরেকটি বড় প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও কোভিড-পরবর্তী শিক্ষাক্ষতি। কয়েক বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন, শ্রেণিকক্ষে শেখার ঘাটতি, অনলাইন শিক্ষায় বৈষম্য এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতায় প্রভাব ফেলেছে। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে সাজেশন, নোট, কোচিং ও সম্ভাব্য প্রশ্ননির্ভর প্রস্তুতিতে অভ্যস্ত হয়েছে; কিন্তু প্রশ্নের ধরন পরিবর্তিত হলে বা মুখস্থের বাইরে গিয়ে ধারণাভিত্তিক উত্তর চাওয়া হলে সেই প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে পরীক্ষায় খারাপ ফল আসা মানেই শিক্ষার্থীরা হঠাৎ অযোগ্য হয়ে গেছে—বরং এটি দীর্ঘদিনের শেখার ঘাটতি কতটা জমে আছে, তারও ইঙ্গিত হতে পারে।
এবারের ফলাফল আরও একটি কঠিন সত্য সামনে এনেছে—শতভাগ পাস ও শূন্য পাস, দুই চরম বাস্তবতার পাশাপাশি অবস্থান করছে। ৩০ হাজার ৪০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৬৯টিতে সবাই পাস করেছে, আবার ৩১২টিতে একজনও পাস করেনি। এই বিপরীত চিত্র বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় মানের বিশাল তারতম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।
প্রশ্ন হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করলে সেখানে কী ভালো হচ্ছে এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের একজনও পাস না করলে সেখানে কী ব্যর্থ হচ্ছে—এই দুই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য কি কার্যকর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে?
তাই এবারের এসএসসি ফলাফলকে শুধু ‘ভরাডুবি’ বলে আলোচনা শেষ করলে চলবে না। বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কোন বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে, কোন অঞ্চলে ফল সবচেয়ে খারাপ, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস বেশি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের সঙ্গে ফলাফলের সম্পর্ক কী, প্রশ্নের কঠিনতা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন এসেছে এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখন-দক্ষতার সঙ্গে পরীক্ষার ফলের সম্পর্ক কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে।
কারণ ফল ভালো দেখানোর জন্য মূল্যায়ন সহজ করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি হঠাৎ কঠোর মূল্যায়ন করে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ব্যর্থ করাও শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষা ও মূল্যায়নব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে পাসের হার নয়, শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতাই হবে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। এবারের ফলাফল সেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

