ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক স্বাধীনতার বড় পরীক্ষা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে ঘিরে তালিকা, তদন্ত কমিটি ও সম্ভাব্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল কয়েকজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রশাসনিক পরিণতির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত প্রকাশের সীমা কোথায় এবং মতাদর্শগত অবস্থান থেকে কখন একটি আচরণ শাস্তিযোগ্য অসদাচরণে পরিণত হয়?
সম্প্রতি বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে একজন শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি কোনো তদন্ত কমিটির ডাক বা অভিযোগের কথা না জেনেই তালিকায় নিজের নাম দেখে বিস্মিত হয়েছেন। একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান সৃষ্টি ও জ্ঞানচর্চার জন্য বিপরীত মতামত জানা, প্রকাশ করা এবং তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকা অপরিহার্য।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিষয়টি এখন একটি বৃহত্তর আইনি ও একাডেমিক পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়েছে।
তালিকায় নাম থাকা কি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমান?
আইনের মৌলিক নীতি হলো—অভিযোগ এবং অপরাধ এক জিনিস নয়।
কোনো শিক্ষকের নাম একটি তালিকায় থাকতে পারে। কিন্তু সেই তালিকা নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। অভিযোগ থাকলে সেটি হতে হবে নির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জানা থাকা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তালিকা ও তদন্তের বিষয়টি এসেছে।
এখানেই প্রথম আইনি প্রশ্ন:
কোন শিক্ষক কী করেছেন—তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ কি আছে?
তিনি কোনো বক্তব্য দিয়েছেন? কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন? কাউকে হুমকি দিয়েছেন? সহিংসতায় যুক্ত ছিলেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে হয়রানি করেছেন? নাকি শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে?
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক মতামত এবং পেশাগত অসদাচরণ একই বিষয় নয়।
ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত: অভিযোগ জানতে হবে
প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি হলো—যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাকে জানতে হবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগটি কী।
অভিযোগের প্রকৃতি না জানিয়ে কাউকে কার্যত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে প্রশ্ন উঠবে:
- অভিযোগটি কী?
- অভিযোগকারী কে?
- ঘটনার তারিখ ও স্থান কী?
- কী প্রমাণ রয়েছে?
- কোন আইন বা বিশ্ববিদ্যালয় বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে?
- অভিযুক্ত শিক্ষককে জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি?
- তিনি সাক্ষ্য ও নথি উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন কি?
- প্রয়োজনে তিনি কি শুনানির সুযোগ পাবেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো তদন্তের নৈতিক ও প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
Natural Justice: ন্যায়বিচার শুধু সিদ্ধান্ত নয়, প্রক্রিয়াও
আইনের ভাষায় natural justice বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারণা হলো—
শুনতে হবে এবং নিরপেক্ষভাবে শুনতে হবে।
অর্থাৎ একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ থাকতে হবে। একইসঙ্গে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ তদন্তকারী যদি আগে থেকেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একটি রাজনৈতিক বা আদর্শিক শ্রেণিতে ফেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তাহলে তদন্তের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সুতরাং প্রশ্নটি শুধু—
“অভিযোগ সত্য কি না?”
তা নয়।
আরও একটি প্রশ্ন:
“অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি কি ন্যায্য?”
একাডেমিক স্বাধীনতার প্রশ্নটি এখানেই
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন, ল্যাবরেটরি বা লাইব্রেরি নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মুক্ত চিন্তার পরিবেশ।
একজন শিক্ষক কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারেন। অন্য শিক্ষক সেটির পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন। তৃতীয়জন উভয় পক্ষের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারেন।
এই সংঘাত থেকেই জ্ঞান তৈরি হয়।
তাই একাডেমিক স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে একজন শিক্ষক যা খুশি করতে পারবেন। বরং এর অর্থ হলো—শিক্ষা, গবেষণা, মতামত ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কে অযৌক্তিক রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রতিশোধের ভয় ছাড়া কাজ করার সুযোগ থাকা।
তবে একাডেমিক স্বাধীনতা কি সীমাহীন?
অবশ্যই নয়।
একজন শিক্ষক যদি মতপ্রকাশের বাইরে গিয়ে সহিংসতায় অংশ নেন, কাউকে ভয় দেখান, শিক্ষার্থী বা সহকর্মীকে রাজনৈতিক কারণে নিপীড়ন করেন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট বিধি লঙ্ঘন করেন—তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত হতে পারে।
কিন্তু সেখানেও মূল প্রশ্ন হবে:
শাস্তি কি তাঁর মতের জন্য, নাকি তাঁর প্রমাণিত আচরণের জন্য?
এই সীমারেখাই একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি রাজনৈতিক আনুগত্য-নির্ভর প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আলাদা করে।
“Chilling Effect”—সবচেয়ে অদৃশ্য বিপদ
ধরা যাক, একজন শিক্ষক একটি রাজনৈতিক বিষয়ে সরকারের বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের বিরোধিতা করলেন। এরপর তাঁর নাম তদন্তের তালিকায় এল।
- পরবর্তী সময়ে অন্য শিক্ষকরা হয়তো আর প্রকাশ্যে প্রশ্ন করবেন না।
- কেউ গবেষণায় বিতর্কিত বিষয় নিতে চাইবেন না।
- কেউ প্রশাসনের সমালোচনা করবেন না।
- কেউ শ্রেণিকক্ষে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করবেন না।
বাইরে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তখন শান্ত দেখাবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণশক্তি শুকিয়ে যেতে পারে।
আইন ও একাডেমিক স্বাধীনতার আলোচনায় এটিই chilling effect—শাস্তির আশঙ্কা এমনভাবে কাজ করা, যাতে মানুষ আইনত বৈধ মত প্রকাশ থেকেও নিজেকে বিরত রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের বহু রাজনৈতিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক মতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রভাব শুধু ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকে না।
আজ যদি একটি মতের জন্য শাস্তির নজির তৈরি হয়, ভবিষ্যতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে অন্য মতও একই ব্যবস্থার শিকার হতে পারে।
অর্থাৎ—আজকের রাজনৈতিক প্রতিশোধ আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রতিশোধের সাংবিধানিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।
তদন্ত হবে—কিন্তু কীভাবে?
তদন্ত বন্ধ করার দাবি যেমন একাডেমিক স্বাধীনতার সমাধান নয়, তেমনি অভিযোগ উঠলেই শাস্তি দেওয়াও ন্যায়বিচার নয়।
বরং একটি গ্রহণযোগ্য তদন্তের জন্য কয়েকটি ন্যূনতম মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন:
- প্রথমত, অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, অভিযোগের প্রমাণ যাচাইযোগ্য হতে হবে।
- তৃতীয়ত, অভিযুক্তকে লিখিতভাবে অভিযোগ জানাতে হবে।
- চতুর্থত, আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে।
- পঞ্চমত, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে স্বার্থের সংঘাতমুক্ত রাখতে হবে।
- ষষ্ঠত, মতাদর্শ নয়—প্রমাণিত আচরণকে শাস্তির ভিত্তি করতে হবে।
- সপ্তমত, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে কার্যত অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
একটি তালিকা কি “blacklist” হয়ে উঠতে পারে?
এখানেও একটি সূক্ষ্ম আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে।
তদন্তের প্রয়োজনে কোনো প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা এবং সেটিকে জনসমক্ষে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হন—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
প্রথমটি তদন্তের প্রশাসনিক উপকরণ হতে পারে। দ্বিতীয়টি ব্যক্তির পেশাগত মর্যাদা ও সুনামের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো—তদন্তাধীন ব্যক্তি এবং দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা।
অতীতের ভুলের বিচার কি নতুন অন্যায়ের মাধ্যমে করা যায়?
জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাবলি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর পরিবর্তন এনেছে। সেই সময় কে কী ভূমিকা পালন করেছেন, তা নিয়ে তদন্ত হতে পারে; অপরাধের অভিযোগ থাকলে বিচারও হতে পারে।
কিন্তু কোনো অতীত অন্যায়ের বিচার করতে গিয়ে যদি একই ধরনের অন্যায্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যায় তখনই অন্যায়—যে পক্ষই তা করুক।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতায় নয়; বরং প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের একই মানদণ্ড প্রয়োগ করার সক্ষমতায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল পরীক্ষা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এখন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
তারা কি এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করতে পারবে যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কোনো শিক্ষক অপরাধ করে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আবার একইসঙ্গে শুধুমাত্র ভিন্নমত বা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কেউ হয়রানির শিকার হবেন না?
এই ভারসাম্যই হলো আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুধু নিজের পছন্দের মতকে নিরাপদ রাখে, তাহলে সেটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থাকে না।
আর যদি অপরাধকে শুধু “ভিন্নমত” বলে আড়াল করা হয়, তাহলেও একাডেমিক স্বাধীনতার অপব্যবহার হয়।
শেষ কথা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাকে তাই “কার পক্ষে কে ছিলেন”—এই সরল রাজনৈতিক সমীকরণে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে।
প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—
- কী ঘটেছিল?
- কোন বিধি বা আইন লঙ্ঘিত হয়েছে?
- তার প্রমাণ কী?
- অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি?
- তদন্তকারী কতটা নিরপেক্ষ?
এবং সর্বোপরি—
একজন শিক্ষককে তাঁর কাজের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে, নাকি তাঁর মতের জন্য?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি এই প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ ও ন্যায্য উত্তর দিতে পারে, তাহলে তদন্তের ফল যাই হোক, প্রতিষ্ঠানটি শক্তিশালী হবে।
কিন্তু যদি ভিন্নমতকে অপরাধ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যকে যোগ্যতার মানদণ্ডে পরিণত করা হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু কয়েকজন শিক্ষক নন—ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুক্ত চিন্তার অধিকার।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো—প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। আর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করতে ভয় লাগে, সেখানে জ্ঞান হয়তো শেখানো যায়; কিন্তু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা যায় না।

