আগের সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেভাবে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হতো, বর্তমান সময়েও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের উপাচার্য করা হচ্ছে, যাদের নিয়োগের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং এর পেছনে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য থাকতে পারে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ‘বাংলাদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা: অবস্থা, প্রকৃতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে একাডেমিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ের মতো এখনো এমন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই অবিশ্বাস্য মাত্রায় নিম্নমানের। তাঁর ভাষ্য, এসব নিয়োগের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয় রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও একাডেমিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে আনু মুহাম্মদ বলেন, শুধু আইনে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার থাকলেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। দেশে চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও সেখানে একাডেমিক স্বাধীনতার যথেষ্ট চর্চা রয়েছে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে দেওয়া স্বাক্ষরের প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর প্রশ্ন, নির্বাচনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষক কীভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে স্বাক্ষর করতে পারেন এবং সেই স্বাক্ষর দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ওপর কোনো চাপ ছিল কি না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি কম উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যেই একাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং এসব মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়ে কতটা আগ্রহ ও অঙ্গীকার রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। ষাটের দশক থেকে ২০২০-২২ সাল পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতির একটি পর্যালোচনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আনু মুহাম্মদ বলেন, ছাত্ররাজনীতির মূল সমস্যা ছাত্রসংগঠন নয়। বরং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্কের কারণেই সমস্যার সৃষ্টি হয়।
তাঁর মতে, সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ছাত্ররাজনীতির পুরো কাঠামো অনেকাংশেই সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
গোলটেবিল আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচারব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস রহমান, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শেখ নাহিদ নিয়াজী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শর্মী হোসেন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আল মামুন।

